‘২৮ বছরেও জুটেনি উদ্বাস্তুদের স্থায়ী ঠিকানা’

সোমবার, ২৯ এপ্রিল ২০১৯ | ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ | 378 বার

‘২৮ বছরেও জুটেনি উদ্বাস্তুদের স্থায়ী ঠিকানা’

ভয়াল ২৯ এপ্রিল আজ। ১৯৯১ সালের এদিনে ‘ম্যারি এন’ নামে প্রলয়ঙ্করী এক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনে ছিল বাংলাদেশের উপকূলে। কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় ওই ঘূর্ণিঝড়ের তা-ব থেকে রেহাই পায়নি। কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী উপজেলার জনপদ ছিন্নভিন্ন ও ল-ভ- হয়ে গিয়ে ছিল ম্যারি এনের ছোবলে।

ঘূর্ণিঝড় ও সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার হলেও বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ছিল দ্বিগুণ। মারা যায় ২০ লাখ গবাদি পশু। গৃহহারা হয় ৫০ লাখ মানুষ।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের ২৮ বছর পেরিয়ে উপকূলীয় এলাকার মানুষ এখনও ভুলতে পারেনি দুঃসহ সেই স্মৃতি। ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী ২৮ বছর ধরে প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন স্বজন হারানো উদ্বাস্তু মানুষগুলো। একদিকে স্বজন হারানোর ব্যথা, অপরদিকে গৃহহীন জীবন যেন তাদের তাড়া করে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। ২৮ বছরেও তাদের ভাগ্যে জোটে নি একটি স্থায়ী ঠিকানা।

এছাড়া উদ্বাস্তু যেখানে বসত করেন সেখানেই উচ্ছেদ আতংক ভর করে তাদের ওপর। এর মধ্যেই অন্ন-বস্ত্র সংগ্রহের নিরন্তর চেষ্টা করতে হয় তাদের। ২৮ বছর পেরিয়েও এসব মানুষ কান্নায় বুক ভারী করেন আর একটি স্থায়ী বসতভিটার আশায় দিনাতিপাত করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে স্বজন হারিয়ে উদ্বাস্তু হওয়া মানুষের একটি ব্যাপক অংশ বসবাস করেন কক্সবাজার শহরের বিমানবন্দরের পশ্চিমের এলাকায়। নাজিরার টেক, কুতুবদিয়া পাড়া, ফদনার ডেইল, সমিতি পাড়া নামের এ এলাকাকে ঘিরে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার পরিবারের বসবাস। তার মধ্যে প্রায় ৮ হাজার পরিবার ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ক্ষতিগ্রস্থ উদ্বাস্তু।

কক্সবাজার পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের বসবাসকারি কুতুবদিয়ার বাসিন্দা প্রবীন মুরব্বী আবদুল গফুর জানান, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ক্ষতিগ্রস্থ ৮ হাজার পরিবারের প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ ওই এলাকায় বসবাস করেন। এসব মানুষের প্রধান পেশা মাছ শিকার ও তা প্রক্রিয়াজাতকরণ। উদ্বাস্তু মানুষগুলো যখন থেকে এ এলাকায় বসবাস শুরু করেন তখন থেকেই এ এলাকাটি অত্যন্ত অবহেলিত। এ এলাকায় এতোদিন বাস করার পরও এখানে তাদের স্থায়ী ঠিকানা গড়ে ওঠেনি। ইতোমধ্যে বিমানবন্দর আন্তর্জাতিকমানের করতে সরকার পুরো এলাকা অধিগ্রহণ করেছে। এতে তৈরী হয়েছে উচ্ছেদ আতংক।সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে স্বজন হারিয়ে উদ্বাস্তু মানুষের মনে এখন কেবল স্থায়ী ঠিকানা তৈরির আকুতি। তারা আর ভবঘুরে থাকতে চান না।

মাবিয়া খাতুন এখন বাস করে পশ্চিম কুতুবদিয়া পাড়ায়। তার স্বামী মৃত বাচু মিয়া। কুতুবদিয়া উপজেলার মধ্যম কৈয়ার বিল এলাকার বাসিন্দা ছিলেন তারা। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল মাবিয়া খাতুন হারিয়েছেন ১৪ জন স্বজন।

তিনি জানান, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল সময়টা ছিলো ১৫ বৈশাখ সোমবার। ওই দিন তুফানে তার দুই ছেলে, দুই মেয়ে, আট নাতি-নাতনি, শ্বশুর ও শাশুড়িকে হারিয়েছেন। এর মধ্যে সাতজনের লাশ পাওয়া গেলেও অন্যদের হদিস পাওয়া যায়নি।
মাবিয়া খাতুন জানান, তুফানে স্বজন হারানোর পাশাপাশি বসতভিটাও সাগরে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি কক্সবাজার শহরের বিমানবন্দরের পশ্চিমে আশ্রয় নেন। ওখান থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পরই পশ্চিম কুতুবদিয়া পাড়ায় আশ্রয় নেন। এখন বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য ওখান থেকেও উচ্ছেদ করার কথা শোনা যাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, ২৮ বছরে বসত ঘর পরিবর্তন করে ভবঘুরে জীবন যাপন করছেন তিনি। বেঁচে থাকা মেয়ে, নাতি-নাতনি নিয়ে মাছই শিকার ও প্রক্রিয়াকরণই এখন জীবিকা ও বেঁচে থাকার একমাত্র পথ।

কুতুবদিয়া উপজেলার আলী আকবর ইউনিয়নের খুদিয়ারটেক এলাকার বাসিন্দা শাকের আহমদ। এখন বসবাস করেন নাজিরারটেক এলাকায়। একটি ঝুপড়ি ঘরে বসে একজন দর্জি হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল তিনি হারিয়েছে সাতজন নিকট স্বজনকে।

শাকের আহমদ জানান, বাবা, মা, স্ত্রী ও চার ছেলে-মেয়ে হারিয়ে তিনি একা। ২৯ এপ্রিল রাত ৯টার দিকে মুহুর্তের মধ্যে সাগরের পানিতে প্লাবিত হয় তার এলাকা। এসময় এক মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রথমে একটি মসজিদে আশ্রয় নেন। মসজিদ বিধ্বস্ত হওয়ার পর ভেসে গিয়ে আশ্রয় জুটে প্যারাবনে। রাত শেষে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও তিনি আর ফিরে পাননি স্বজন। এরপর এসে নাজিরারটেক এলাকায় আশ্রয় নেন ১৯৯২ সালে।

তিনি জানান, তিনি ছাড়াও ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ক্ষতিগ্রস্ত ৮ হাজার পরিবার ওই গ্রামে বসবাস করেন। বিমানবন্দরের জন্য এদের উচ্ছেদ করার কথা শোনা যাচ্ছে। এতে তিনি আতংকে রয়েছেন। তার দাবি সরকার তাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করুক।

এদিকে, কক্সবাজার বিমান বন্দরের জন্য জমি অধিগ্রহণের পর উদ্বাস্তুদের পুর্ণবাসন করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে খুরুশকুলে নির্মিত হয়েছে শেখ হাসিনা আশ্রয়ণ কেন্দ্র। যেখানে এসব মানুষের আশ্রয় হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2020

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!