সৈকতে বর্জ্য অপসারণে দায়হীনতা

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০ | ১:২২ অপরাহ্ণ | 86 বার

সৈকতে বর্জ্য অপসারণে দায়হীনতা
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে প্লাস্টিক, পলিথিন, মদের বোতল, ছেঁড়া জাল ও রশিসহ নাণা ধরণের বর্জ্য ও জলজ প্রাণী ভেসে সঠিক কারণ এখনো উদঘাটিত হয়নি; তবে সমুদ্র বিজ্ঞানীসহ বিশেষজ্ঞদের ধারণা, গভীর সাগরে মাছ ধরার ট্রলার ও পন্যবাহী জাহাজ থেকে এসব বর্জ্যগুলো ফেলা হয়ে থাকতে পারে।
এদিকে বর্জ্য ও জলজ প্রাণী ভেসে আসার কারণ উদঘাটনে গঠিত তদন্ত কমিটি কাজ করছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। এছাড়া উচ্চতর বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেয়ার জন্য বন ও পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চেয়েছে জেলা প্রশাসন।
অন্যদিকে পড়ে থাকা বর্জ্য ও মৃত প্রাণীগুলোর দুর্গন্ধে সৈকতের সৌন্দর্য্য আর পরিবেশ দূষণের শিকার হলেও সোমবার বিকাল পর্যন্ত এ নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কোন তৎপরতা দেখা যায়নি।
সোমবার বিকালে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন জানিয়েছেন, শনিবার রাত থেকে সমুদ্র সৈকতের একটি অংশজুড়ে নানা ধরণের বর্জ্য ও জলজ প্রাণী ভেসে আসার খবরে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে প্রশাসনের একটি দল ঘটনাস্থল পরির্দশন করেন। এসময় দলটির সদস্যরা সৈকতে বিপুল পরিমান বর্জ্য, কিছুসংখ্যক মৃত ও আহতাবস্থায় জলজ প্রাণী পড়ে থাকতে দেখেন।
কামাল বলেন, “ এর প্রেক্ষিতে রোববার সন্ধ্যায় ঘটনার কারণ উদঘাটনের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আশরাফুল আফসারকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে সদস্য রাখা হয়েছে, বনবিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, মৎস্য সম্পদ ও প্রাণী সম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। কমিটিকে আগামী ৭ দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসনের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ”
তবে এখন পর্যন্ত বর্জ্যগুলো ভেসে আসার কোন কারণ সম্পর্কে তদন্তদল সহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা অবহিত নন বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
এছাড়া ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে উচ্চতর বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেয়ার জন্য বন ও পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চাওয়া হবে বলেন, কামাল হোসেন।
শনিবার রাত থেকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে শুরু করে হিমছড়ি পয়েন্ট পর্যন্ত এলাকার সৈকতজুড়ে ভেসে আসে প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য, ছেঁড়া স্যান্ডেল, মদের বোতল, মাছ ধরার জাল, রশি ও নানা উপকরণ। এসব বর্জ্যরে সঙ্গে ভেসে আসে সামুদ্রিক কাছিমসহ নানা জলজ প্রাণী। যেগুলোর মধ্যে কিছুসংখ্যক মৃত ও আহত অবস্থায় ছিল।
তবে খবর পেয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনের সদস্যরাসহ স্থানীয়রা শতাধিক আহত জলজ প্রাণীকে অবমুক্ত করে সাগরে ছেড়ে দিয়েছে। আর মৃত প্রাণীগুলোকে মাটিতে পুতে ফেলার ব্যবস্থা নিয়েছে। তারা অন্তত ২০ টি মৃত কাছিম ও ১ টি ডলফিন মাটি চাপা দেয়।
এদিকে সোমবারও ১৫ টি আধা-মরা ও ৫ টি মৃত কাছিম লাবণী, সুগন্ধা আর কলাতলী পয়েন্টের সৈকতে ভেসে আসে বলে জানিয়েছেন সী সেইভ লাইফ গার্ডের উদ্ধারকর্মি মোহাম্মদ ওসমান।
ওসমান বলেন, এগুলোর মধ্যে আহতাবস্থায় থাকা সামুদ্রিক কাছিমগুলো লাইফ গার্ড কর্মিরা উদ্ধার করে সাগরে অবমুক্ত করলেও মৃতগুলো বালিয়াড়িতে পড়ে থাকতে দেখেছেন।
এছাড়া সোমবার বিকাল পর্যন্ত সৈকতের বিশাল একটি অংশজুড়ে ভেসে আসা বর্জ্যগুলো আর মৃত জলজ প্রাণীগুলো বালিয়াড়িতে পড়ে থাকলেও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের এগুলো অপসারণ বা পরিস্কারের জন্য কোন ধরণের তৎপরতা চোখে পড়েনি বলে জানিয়েছেন লাইফ গার্ডের এ উদ্ধারকর্মি।
এ নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. নাজমুল হুদার মুঠোফোনে গত ২ দিন ধরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা সম্ভব হয়নি প্রতিবেদকসহ স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মিদের।
এদিকে সৈকতে নানা ধরণের বর্জ্য ভেসে আসার কারণ জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সাইয়েন্স এন্ড ফিশারিশ বিভাগের ডিন প্রফেসর রাশেদ-উন নবীর সঙ্গে কথা কথা বলেন, ঘটনার অনুসন্ধান করার পরই প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া সম্ভব। তারপরও অনুমান করে বলা যায়, মূলত সাগরে মাছ ধরা ট্রলার বা গভীর সাগরে চলাচলকারি জাহাজ থেকে এসব বর্জ্য ফেলা হয়ে থাকতে পারে।
প্রাথমিক ধারণার কথা জানিয়ে এ সমুদ্র বিজ্ঞানী রাশেদ-উন নবী বলেন, এটির ২ টি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, গত ২০ মে থেকে সাগরে মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে। সরকারি নির্দেশনা মতে যদিও মাছ ধরা বন্ধ তারপরও অনেকে হয়তো ট্রলার বা বেবি ট্রলার যারা চালায় তারা কোস্টগার্ডসহ সংশ্লিষ্টদের নজর ফাঁকি দিয়ে সাগরে যাচ্ছে। এর প্রেক্ষিতে ওই সমস্ত ট্রলার থেকেও বর্জ্যগুলো ভেসে আসতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সাগরে আমাদের (বাংলাদেশ) দেশের ট্রলারগুলো মাছ ধরা বন্ধ রেখেছে ঠিকই, কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশগুলির ট্রলার তো আর মাছ ধরা বন্ধ রাখেনি। ওই ট্রলারগুলো থেকেও বর্জ্যগুলো ভেসে এসে থাকতে পারে।
“ যার ফলে এটা এখনই একেবারে কংক্রিট বলা যাবে না যে, এসব বর্জ্য কোথা থেকে এসেছে। তবে আপাতত ২ ধরণের সম্ভাবনাই থাকতে পারে” এমনটি মন্তব্য করেন প্রফেসর রাশেদ-উন নবী।
এদিকে বর্জ্যের সঙ্গে ভেসে আসা জলজ প্রাণীগুলোর মৃত্যুর কারণ হিসেবে এ সমুদ্র বিজ্ঞানী বলেন, মাছ ধরার ছেঁড়া জালে আটকা পড়েই মূলত সামুদ্রিক কাছিমগুলোর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া পলিথিন বর্জ্য খাওয়ার পাশাপাশি দূর্ষণের কারণেও জলজ প্রাণীগুলোর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
তবে মৃত্যু হওয়া জলজ প্রাণীগুলোর ময়নাতদন্ত করার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে জানান সম্ভব হবে বলে মন্তব্য করেন রাশেদ-উন নবী।
অন্যদিকে সৈকতজুড়ে পড়ে থাকা বর্জ্য ও মৃত জলজ প্রাণীগুলো সরিয়ে নিতে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন।
কামাল বলেন, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আগামী ২/৩ দিনের মধ্যে সৈকতের বর্জ্যগুলো সরিয়ে নেয়া হবে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
এছাড়া মৃত প্রাণীগুলোকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পুতে ফেলার পাশাপাশি আহতাবস্থায় থাকা প্রাণীদের সাগরে অবমুক্ত করা হয়েছে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2020

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!