এইমাত্র পাওয়া

x

রামু ট্রাজেডি

সম্প্রীতি ফিরলেও বিচার নিয়ে হতাশা

রবিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৭:২৭ অপরাহ্ণ | 39 বার

সম্প্রীতি ফিরলেও বিচার নিয়ে হতাশা

‘রামু সহিংসতার’ ঘটনায় সম্প্রীতির পাশাপাশি সকল ধর্ম সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ফিরে এলেও বৌদ্ধদের চাওয়া এ ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। তবে বিচার কার্য নিয়ে হতাশা লক্ষ্য করা গেলেও; তাদের দাবি, প্রকৃত দোষীদের শাস্তিদানের।
কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ মন্দির ও পল্লীতে সহিংস ঘটনার ৭ বছর পূর্তিতে এসে এমনটি অভিব্যক্তি জানিয়েছে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন।

তবে মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনি সহায়তাকারিরা জানিয়েছেন, মামলাটি স্পর্শকাতর হওয়ায় তদন্তে দীর্ঘ সময়ক্ষেপন হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের লোকজন যথার্থ স্বাক্ষ্যদান করলে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি দেয়া সম্ভব হবে।
বিগত ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রামুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে উত্তম বড়ুয়া নামের এক যুবকের আইডিতে ‘পবিত্র কোরআন অবমাননাকর’ ছবি পোস্ট করার গুজবের জেরে একদল দূর্বৃত্ত মিছিল সহকারে বৌদ্ধ মন্দির এবং পল্লীতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর চালায়। একই ঘটনার জেরে পরদিন হামলা চালানো হয় উখিয়া ও টেকনাফের আরো কয়েকটি মন্দিরে।
এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৩ টি মন্দির ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ৩০ টি বসত বাড়ী। আগুনে পুড়ে যায় অসংখ্য পুরাকীর্তি, শত শত ছোট-বড় বুদ্ধমূর্তি, কয়েকটি ভাষার ত্রিপিটিক এবং গৌতম বুদ্ধের অমূল্য ধাতু (দেহভস্ম)।

যদিও পরবর্তীতে সরকারি পৃষ্টপোষকতায় নান্দনিকভাবে নির্মিত হয় এসব বৌদ্ধ বিহার ও বসত বাড়ীগুলো। পরে গত ২০১৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পুননির্মিত এসব বৌদ্ধ মন্দির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এর প্রেক্ষিতে বৌদ্ধদের ক্ষোভ-আক্ষেপ কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়। ঘটনার ৮ বছরে এসে তারা ভুলে থাকতে চান এসব ঘটনা। তাদের বিশ্বাস, রামুতে আগের মত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরে এসেছে। সকল ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সহাবস্থান রয়েছে।
তবে মামলার দীর্ঘসূত্রিতার পাশাপাশি বিচারকার্য এখনো সম্পন্ন না হওয়ায় হতাশা রয়েছে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনের মাঝে। তাদের দাবি, কোন নিরাপরাধ ব্যক্তি যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়; প্রকৃত দোষীদের বিচারে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিদানের এবং এ ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেই দৃষ্টান্ত।

‘রামু সহিংসতার’ ঘটনায় মামলা হয়েছিল ১৯ টি। এর মধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে ১৮ টি। অন্য মামলাটির বাদী হন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি। যদিও পরে মামলার বাদী বিবাদীদের সঙ্গে আপোষনামা দিয়ে প্রত্যাহার করেছেন। বিচারাধীন ১৮ টি মামলায় স্বাক্ষী না পাওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘসূত্রিতা।
রামুতে আগের মত সম্প্রীতি ফিরে এসেছে বলে মন্তব্য করেন পূর্ব মেরংলোয়া এলাকার বাসিন্দা শুভাশীষ বড়ুয়া।

শুভাশীষ বলেন, অতীতে যা হবার হয়েছে; এখন এসব ভুলে থাকতে চাই। সকলে মিলেমিশে সম্প্রীতির বন্ধনে বসবাস করতে চাই। যেন ‘রামু সহিংসতার’ মত ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির ও বসত বাড়ীগুলো পুননির্মিত হলেও মনের ক্ষত চিহ্ন এখনো মুছেনি বলে মন্তব্য করেন রামু মেরংলোয়া এলাকার বাসিন্দা দীপংকর বড়ুয়া।

দীপংকর বলেন, ঘটনার দীর্ঘ ৭ বছর পেরিয়ে গেলেও মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। মামলার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে প্রকৃত দোষীরা শাস্তির আওতা থেকে পার পেয়ে যেতে পারে।

দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, কোন নিরাপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন। প্রকৃত দোষীদের যাতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হয়।
‘রামু সহিংসতার’ মত দ্বিতীয় কোন ঘটনা যাতে বাংলাদেশে আর না ঘটে সেটার একটা দৃষ্টান্ত রচিত হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন রামু কেন্দ্রিয় সীমা বিহারের আবাসিক ভিক্ষু প্রজ্ঞানন্দ থের।

প্রজ্ঞানন্দ বলেন, এ ঘটনায় শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় নয়; জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকলের প্রত্যাশা ছিল প্রকৃত দোষীদের শাস্তি দিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে। এ ঘটনার বিপরীতে যেসব মামলা হয়েছে তার সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোন নিরাপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন এবং প্রকৃত দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা হয়।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফরিদুল আলম বলেন, এ ঘটনার বিচার প্রক্রিয়াটা দীর্ঘ ৫ বছর ধরে তদন্তের মাধ্যমে বিচারের পর্যায়ে এসেছে। ঘটনায় দায়ের ১৯ টি মামলার মধ্যে বাদীর সম্মতিতে ১ টি প্রত্যাহার হয়েছে এবং ১৮ টি বিচারাধীন রয়েছে।

“ বিচারাধীন এসব মামলায় অন্তত ১০ সহস্রাধিক ব্যক্তিকে আসামী করা হলেও তদন্ত পরবর্তী চার্জশীটভূক্ত আসামী রয়েছে ৯৩৬ জন। তারা সকলেই জামিনে আছে। ”
রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী বলেন, “ মামলায় কয়েকজন স্বাক্ষ্যদানও করেছেন। অন্যান্য স্বাক্ষীরা আদালতে স্বাক্ষ্য উপস্থাপন করলে মামলাটি দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। ”

মামলার দীর্ঘসূত্রিতার জন্য তদন্তকাজে সময়ক্ষেপনকে দায়ী মন্তব্য করে পিপি ফরিদুল বলেন, মামলার তদন্তকালীন সময়টার কারণে দীর্ঘসূত্রিতা বলে মনে হয়েছে। মামলাগুলো অন্তত ১০/১৫ হাজার এজাহারভূক্ত আসামী ছিল। সে কারণে তদন্ত কাজে সময় ব্যয় হয়েছে বেশী। ”

রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী বলেন, পুলিশ যদি মামলার স্বাক্ষীদের আদালতে উপস্থাপন করতে পারেন। স্বাক্ষীরা যদি যথাযথ স্বাক্ষ্যদান করে তাহলে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি দিয়ে বিচারকার্য সম্পন্ন করা যাবে।
ফরিদুল বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের স্বাক্ষীরা যদি সত্য স্বাক্ষ্য উপস্থাপন করেন তাহলে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত হবে এবং ঘটনার সত্য উদঘাটন হবে।

মামলার স্বাক্ষীদের আদালতে স্বাক্ষ্য উপস্থাপনের বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও রামুসহ কক্সবাজারের বৌদ্ধ পল্লীগুলোতে পুলিশের সার্বক্ষণিক নজরদারী রয়েছে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন।
এসপি মাসুদ বলেন, রামুতে সহিংস ঘটনার পর থেকে বৌদ্ধ মন্দির ও পল্লীগুলোতে পুলিশের টহল জোরদার রয়েছে। এমন কি গত ২০১৭ সালে এ দেশে রোহিঙ্গা আসার পর বৌদ্ধ সম্প্রদায় কিছুটা আতংকের মধ্যে থাকলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পদক্ষেপে তা এখন স্বভাবিক রয়েছে।

পর্যায়ক্রমে কক্সবাজারের সব বৌদ্ধ মন্দির ও পল্লীতে নিরাপত্তা জোরদার করার রয়েছে বলে জেলা পুলিশের এ কর্তা।

আবরারের মৃত্যু আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়ে গেল – ইশতিয়াক আহমেদ
দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2019

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!