এইমাত্র পাওয়া

x

শহীদ তিতুমীর ইনস্টিটিউটে ‘কোচিং বাণিজ্য’

রবিবার, ২৮ এপ্রিল ২০১৯ | ৪:৩৯ অপরাহ্ণ | 261 বার

শহীদ তিতুমীর ইনস্টিটিউটে ‘কোচিং বাণিজ্য’

কোচিং ফি আদায় না করায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণে বাধাসহ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘কোচিং বাণিজ্যের’ অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজার শহরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শহীদ তিতুমীর ইনস্টিটিউটের বিরুদ্ধে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগে রয়েছে, শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক নিজস্ব কোচিং সেন্টারে পড়তে বাধ্য করার।

এ নিয়ে প্রতিবাদকারি অভিভাবকদেরও হেনস্তা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তবে এ বিষয়ে শহীদ তিতুমীর ইনস্টিটিউটের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কেউ সাড়া দেননি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মতামত বা বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এ নিয়ে প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়টির খোঁজ খবর নিয়ে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ এপ্রিল থেকে কক্সবাজার শহরের ঐতিহ্যবাহী প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘শহীদ তিতুমীর ইনস্টিটিউটের’ উত্তর ও দক্ষিণ শাখায় একযোগে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শুরু হয়। এর আগে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা হয় বকেয়া বেতন ও কোচিংসহ বিভিন্ন ধরণের ফি। অনেকে শিক্ষার্থী পরীক্ষা শুরুর দিনই বেতন-ফি আদায় করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে যারা বকেয়া ফি-গুলো আদায় করতে পারেনি তাদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে বাধা দেয়ার ঘটনা ঘটনাও ঘটেছে। এ নিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে, অভিভাবকদের হেনস্তাসহ নানাভাবে হুমকী-ধমকিরও।

এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান ব্যতিরেকে কোচিং ক্লাশে পড়ানো সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও শহীদ তিতুমীর ইনস্টিটিউটে তা মানা হচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই প্রতিষ্ঠানটির ‘উত্তর ও দক্ষিণ শাখায়’ কোচিং ক্লাশে পাঠদানের নামের জোরপূর্বক আদায় করা হচ্ছে অন্যায্য বেতন-ফি।

শহীদ তিতুমীর ইন্সটিটিউটের উত্তর শাখার পঞ্চম শ্রেণীর ‘বি-শাখায়’ অধ্যায়নরত আবিদুর রহমান আবীর নামের এক শিক্ষার্থী। চলতি শিক্ষাবর্ষে সে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার পর থেকে স্কুলের বেতনসহ অন্যান্য ফি আদায় করতে পারেনি। পরীক্ষার দিন সকালে তার অভিভাবক (পিতা) বকেয়া বেতন ও অন্যান্য ফি আদায় করতে গেলে প্রতিষ্ঠানটির কোচিং বাণিজ্যের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়ে।

এ নিয়ে তার পিতা সরকারিভাবে স্কুলে কোচিং পড়ানোর নিষেধাজ্ঞার কথা জানালেও উল্টো তাকে হেনস্তা হতে হয়েছে। এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির এক পরিচালকের সন্তান বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে কটুক্তিমূলক মন্তব্য করে দেখে নেয়ারও হুমকী দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

শুধু আবিদুর রহমান আবীর নয়, স্কুলটির সব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কোচিং ক্লাশে পড়ানোর নামে অবৈধভাবে আদায় করা হচ্ছে অন্যায্য ফি। কেউ কোচিং ক্লাশে পড়তে চাইলেও জোরপূর্বক বাধ্য করা হয়; এমন কি কোচিং ক্লাশে অংশ না নিলেও।

এ নিয়ে স্কুলটির পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র আবিদুর রহমান আবীরের পিতা মোহাম্মদ মুসা অভিযোগ জানিয়ে বলেন, গত ২৩ এপ্রিল শহীদ তিতুমীর ইনস্টিটিউটে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শুরু হয়েছে। পরীক্ষার দিন সকালে ছেলেকে নিয়ে স্কুলে যান। চলতি শিক্ষাবর্ষে স্কুলে ভর্তি হওয়ার ২ মাস পর একটি দুর্ঘটনায় সে মারাত্বক আহত হয়। এতে পরবর্তী ২ মাস স্কুলে যাতায়তও করতে পারেনি। তারপরও তাকে নিয়ে স্কুলের প্রশাসনিক কক্ষে বকেয়া বেতন-ফি আদায় করে প্রবেশপত্র সংগ্রহ করতে যান।

“ এসময় স্কুলে তার প্রতিমাসের বকেয়া বেতন ও অন্যান্য ফি আদায় করার সময় ‘বকেয়া কোচিং ফি’ দাবি করা হয়। আমার ছেলে দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার কারণে গত দু’মাস স্কুলের নিয়মিত ক্লাশ ও কোচিং ক্লাশে অংশগ্রহণ করতে না পারার কথা জানালেও অন্যায্য ফি আদায় করতে বাধ্য করা হয়। ”

এমন কি কোচিং ফি বাবদ বকেয়া টাকা আদায় করা না হলে সন্তানকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেয়া হবে না বলেও হুমকী দেয়, বলেন অভিভাবক মুসা।
মুসা বলেন, “ কোচিং ক্লাশের নামে চলতি শিক্ষাবর্ষের প্রথম ২ মাসের বাবদ ৫০০ টাকা এবং পরবর্থী ২ মাসের জন্য ১৪০০ টাকা বকেয়া ফি আদায় করা হয়েছে। ”

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে একটি পোস্ট দেয়া হলে অভিভাবককে শহীদ তিতুমীর ইনস্টিটিউটের প্রধান পরিচালক শফিকুল ইসলাম ওরফে শফিক মাস্টারের ছেলে রাকিব মোহাম্মদ-ই কটুক্তিমূলক মন্তব্য করে দেখে নেয়ার হুমকী দেন বলে জানান মোহাম্মদ মুসা।

অভিভাবক মুসার পোস্টে রাকিব মোহাম্মদ মন্তব্য করেন, “অভাবীদের জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। অহেতুক ব্রান্ড স্কুলে পড়াবেন, টাকা দেওয়ার ক্ষমতা না থাকবে না; তাহলে যাকাত ফিতরার টাকার জন্য প্রস্তুতি নেন। ”

মুসার অভিযোগ, শুধুমাত্র তার সন্তান আবীর নয়; তার মত অনেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শুরুর দিন জোরপূর্বক অন্যায্য কোচিং ফি আদায় করতে দেখেছেন।
এ দিকে শহীদ তিতুমীর ইনস্টিটিউটের উভয় শাখার ( উত্তর ও দক্ষিণ ) কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক নিজস্ব কোচিং সেন্টারে পড়তে বাধ্য করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব কোচিং সেন্টারের কোন শিক্ষার্থী পড়া আদায়ে ব্যর্থ হলে শারীরিকভাবে শাস্তি দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগে গত ২৪ এপ্রিল কক্সবাজার সদর থানায় এক শিক্ষককের বিরুদ্ধে জনৈক এক অভিভাবক কর্তৃক অভিযোগ দায়ের করার ঘটনাও ঘটেছে।

যদিও অভিযুক্ত শিক্ষক পরবর্তীতে অভিভাবকের কাছে ক্ষমা চেয়ে ঘটনার আপোষরফা করেছেন।

থানায় দায়ের করা অভিযোগসূত্রে জানা যায়, গত ২৪ এপ্রিল দুপুরে শহীদ তিতুমীর দক্ষিণ শাখার দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র মোহাম্মদ রায়াত স্কুলটির শিক্ষক রুহুল আমিনের কক্সবাজার শহরের পূর্ব পাহাড়তলী ইউসুলের ঘোনার বাড়ীতে নিজস্ব কোচিং সেন্টারে পড়তে যায়। এসময় কোচিং করার এক পর্যায়ে পড়া আদায় করতে ব্যর্থ হওয়া তাকে শিক্ষক বেদড়ক মারধর করে। এতে সে রক্তাক্ত জখম হয়। পরে খবর ছাত্রটির পিতা তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে এ নিয়ে রায়াতের পিতা রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।

এ ঘটনার পর নানা মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হলে স্কুলটির প্রধান শিক্ষকসহ পরিচালনা সংশ্লিষ্টরা দেনদরবার করে অভিভাবকের সঙ্গে আপোষরফা করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এ দিকে নিয়মিত পাঠদানের ক্লাশ ছাড়া কোচিং ক্লাশের ব্যাপারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কক্সবাজার শহরের ঐতিহ্যবাহী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘শহীদ তিতুমীর ইনস্টিটিউট’ কর্তৃপক্ষ বরাবরই তা অমান্য করে চলছে বলে সত্যতা পাওয়া গেছে।

এ ব্যাপারে স্কুলটির প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ নেছারের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে পরপর ২ দিন যোগাযোগ করা হলেও অন্যায্য কোচিং ফি আদায় এবং শিক্ষককের নিজস্ব কোচিং সেন্টারে ছাত্রকে মারধরের ঘটনা নিয়ে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

মুঠোফোনে কল করার প্রথমদিন সাড়া দিয়ে প্রধান শিক্ষক নেছার বলেন, জরুরী এক মিটিংয়ে আছেন। এখন কথা বলা সম্ভব না। পরবর্তীতে তিনি ফোনে বিস্তারিত জানাবেন। পরে এদিন আবারও তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে কল দেয়া হলে তিনি আর সাড়া দেননি।

এ ব্যাপারে কথা বলতে স্কুলটির দক্ষিণ শাখার পরিচালক মো. রফিক উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন ধরণের সাড়া দেননি।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ( শিক্ষা ও আইসিটি ) মো. সরওয়ার কামাল বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদানের বাইরে কোচিং ক্লাশ না করানোর ব্যাপারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যদি কোন প্রতিষ্ঠান ব্যতয় ঘটায় তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2019

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!