‘যে মায়ের কান্না থামেনি এখনো’

সোমবার, ২৯ এপ্রিল ২০১৯ | ১২:০২ অপরাহ্ণ | 418 বার

‘যে মায়ের কান্না থামেনি এখনো’

ভয়াল ২৯ এপ্রিল আজ। ১৯৯১ সালের এইদিনে ‘ম্যারি এন’ নামে ভয়াবহ এক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল বাংলাদেশের উপকূলে। কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকা কুতুবদিয়ার বড়ঘোপ ইউনিয়নে সেদিন নিজ চোখের সামনে তিন সন্তান ভেসে যেতে দেখেছেন এক মা’। তার নাম ছকিনা বেগম (৪০)। তিনি ২৮ বছর পরে এসেও কোনভাবে ভুলতে পারছেন না দুঃসহ সেই স্মৃতি। সন্তানদের কথা বলতেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি।

ছকিনা বেগমদের মতো হতভাগা এসব মানুষ এখন কক্সবাজার শহরের সমিতি পাড়া, ফদনার ডেইল, কুতুবদিয়া পাড়ায় বসবাস করছে।

শহরের কুতুবদিয়া পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, একটি কুড়ে ঘরে দরজায় বসে আছেন সন্তান হারা ছকিনা বেগম। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, পানি আসছে এমন খবর বলার সাথে সাথে আমি এবং আমার তিন সন্তান হ্যাপী, হেলাল উদ্দিন ও তিন মাসের হালিমাকে নিয়ে বাড়ির উপরে উঠে যায়। এরপর একটি গাছ ধরে ছিলাম। কিন্তু বড় বড় ঢেউয়ে এসে আমার গায়ে পড়ছিল। এক পর্যায়ে আমাকে ধরে থাকা হেলাল উদ্দিন ও হ্যাপীকে একটি ঢেউ এসে নিয়ে যায়। হাত ভাড়িয়েও আমার সন্তানদের ধরে রাখতে পারিনি আমি। পরে বড় একটি দেয়ালের ধাক্কায় কুলে থাকা তিন মাসের হালিমাও ভেসে যায়। এরপর আমি কোথায় ছিলাম কিভাবে তারা আমাকে পেলো আমি বুঝতে পারিনি। এরপর একটি গরুর খামারে নিয়ে লোকজন আমাকে রেখেছে তখন আমি কিছুটা বুঝতে পেরেছি যে আমাকে কেউ উদ্ধার করেছে।

ছকিনা বেগম আরও বলেন, ওই সময় আমার স্বামী তার চাচার বাসায় ছিল। প্রচন্ড বাতাসের কারণে সে আর আমাদের কাছে ফিরতে পারেনি। কিন্তু পরবর্তী সে আমাকে খুজে বের করে এবং আমাকে নিয়ে কক্সবাজারে আসে। এরপর থেকে সন্তান হারানোর কষ্ট আর জীবনে চলার কষ্ট নিয়ে আজ ২৮ বছর পার করছি। কিন্তু প্রতিনিয়ত সন্তানদের জন্য কষ্ট হয়।

ছকিনার মতো মা’-বাবাকে হারিয়েছেন একই এলাকার জাকির হোসেন (৫০)। একটি বেড়িবাধে বসে সে এ প্রতিবেদককে জানাচ্ছিলেন সে ভয়াবহতার কথা। জাকির হোসেন জানান, ২৯ এপ্রিল বিকেল থেকে বাতাস শুরু হয়। এরপর থেকে সবার মনে একটি ভয় কাজ করছিল। আমার বাবা-মাও সবার মতো ভয় পাচ্ছিল। কারণ বেড়িবাধের অবস্থা ভাল ছিল না। রাতে পানি এসে সব তলীয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তখন আমরা কয়েকজন নারিকেল গাছে। বাবা-মা বাড়ির উপরে উঠেছিল। সেখান থেকে তারা ভেসে যায়। পরে তাদের অনেক খোজাখুজির পরও পায়নি। এরপর থেকে এখন কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়া পাড়ায় বসবাস করি। সব হারিয়ে অনেক কষ্টের জীবন পার করছি।

সেদিন ‘ম্যারি এন’ নামক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল। উপকূলের প্রায় ২০ লাখ মানুষকে সরিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু তারপরও ১ লাখ ৩৮ হাজারেরও বেশি মানুষ এবং ৭০ হাজার গবাদিপশুও মারা যায়। এছাড়াও গৃহহারা হয়েছিল ৫০ লাখ মানুষ।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের ২৮ বছর পেরিয়ে গেলো। এ ২৮ বছর ধরে প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন স্বজন হারানো উদ্বাস্তুু মানুষগুলো। একদিকে স্বজন হারানোর ব্যাথা, অপরদিকে গৃহহীন জীবন যেন তাদের তাড়া করে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। ২৭ বছরেও জোটেনি স্থায়ী বসত বাড়ি। আর যেখানে বসত করেন সেখানেই উচ্ছেদ আতঙ্কের মধ্যে জীবিকার সংগ্রামে রয়েছেন তারা।

এদিকে, ২৯ এপ্রিল স্মরণে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠন দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। র‌্যালি ও শোক সভার আয়োজন করা হয়েছে।

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2020

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!