দুদকের হাতে আটক আজিজ কারাগারে, রফিক রয়েছে নানা তদবিরে

মৌলভী আজিজ ও রফিকের ক্ষমতার দাপট কোথায়?

শুক্রবার, ০১ নভেম্বর ২০১৯ | ৭:০৫ অপরাহ্ণ | 69 বার

মৌলভী আজিজ ও রফিকের ক্ষমতার দাপট কোথায়?

উখিয়া ও টেকনাফের সাবেক সাংসদ আব্দুর রহমান বদির আস্থাভাজন হিসাবে পরিচিত টেকনাফ বাহারছড়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ উদ্দিনকে সাড়ে ৩৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আটক করেছে। একই সাথে তার সাবেক ইউপি সচিব রিয়াজুল আলমকেও আটক করা হয়েছে। একইদিন তাদের দুইজনকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই নিয়ে আরেক ভাই ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকায় নামা থাকা মৌলভী রফিক উদ্দিন রয়েছে নানা তদবিরে। সারাদিন জেলা ও উপজেলা আওয়ামীলীগের বিভিন্ন নেতার কাছে ধরনা দিচ্ছে এবং কারাগার থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে একাধিক আইনজীবীর সাথে আলাপ অব্যাহত রেখেছে।

টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুরস্থ পুরানপাড়া গ্রামের মৌলভী নাসির উদ্দিনের দুই ছেলে মৌলভী আজিজ উদ্দিন ও মৌলভী রফিক উদ্দিন। এককালে সীমাহীন কষ্টে সংসার জীবন অতিবাহিত করা আজিজ-রফিকরা আজ বিত্তশালী ও ক্ষমতাধর। এক সময়ের জামায়াত-বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ক্ষমতার পালাবদলে রঙ পাল্টে হয়ে যান আওয়ামলীগের বিশ^স্ত নেতা।

এরমধ্যে মৌলভী আজিজ উদ্দিন উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সাংসদ আব্দুর রহমান বদির হাতধরে ভাগিয়ে নেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতির পদটিও। ক্ষমতাসীন দলের সাবেক সংসদ বদির ছত্রছায়ায় এলাকায় ইয়াবাপাচার, মানবপাচার ও জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের করা তালিকায় মৌলভী আজিজ উদ্দিন ও মৌলভী রফিক উদ্দিনের নাম রয়েছে গডফাদারের শীর্ষে। অথচ, গত দেড় বছর ধরে টেকনাফ ও জেলার বিভিন্ন স্থানে মাদক বিরোধী অভিযানে আইনশৃংখলা বাহিনীর নানা তৎপরতা থাকলেও রহস্যজনক কারণে অক্ষত অবস্থায় রয়েছে এই দুই ভাই। এরমধ্যে সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৩১ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে দুদকের হাতে আটক হন মৌলভী আজিজ উদ্দিন।
ক্ষমতাধর এই দুই ভাইয়ের মধ্যে মৌলভী রফিক উদ্দিন টেকনাফ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও মৌলভী আজিজ উদ্দিন বাহারছড়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান। উখিয়া ও টেকনাফ আসনের সাবেক সাংসদ আব্দুর রহমান বদির আস্থাভাজন হিসাবে পরিচিত এই দুই ভাইয়ের নাম রয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রাণালয়ে তালিকাভূক্ত গডফাদারের তালিকায়।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম-২ এর উপ-সহকারি পরিচালক গোলাম মোস্তফা জানিয়েছেন, ‘টেকনাফ বাহারছড়া ইউপি চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ উদ্দিনকে ভূঁয়া প্রকল্প দেখিয়ে সাড়ে ৩৫ লাখ টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আটক করা হয়েছে। গত দুইদিন দুদক চট্টগ্রাম-০২ উপ-পরিচালক মাহবুবুল আলমের নেতৃত্বে দুদকের একটি দল বিভিন্ন এলাকায় কড়ানজরধারি মাধ্যমে মৌলভী আজিজ উদ্দিন ও সাবেক সচিব রিয়াজুল আলমকে (বর্তমানে সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত) আটক করা হয়। বাহারছড়া ইউনিয়নের ১২টি প্রকল্পের কোন কাজ না করে ভূঁয়া বিল ভাউচার দেখিয়ে ৩৫ লাখ ৫১ টাকা আত্মসাত করে। এর অভিযোগে দুদক তাদের আটক করে। পরে দুপুর ১২টার দিকে তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করে (মামলা নং-১৩) কক্সবাজার সিনিয়র স্পেশাল আদালতে সোর্পদ করা হয়। পরে আদালত শুনানি শেষে তাদের জেল হাজতে প্রেরণ করেন এবং আগামী ২৫ নভেম্বর মামলার দিন দার্য্য করেন।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, দুদকের হাতে আটক টেকনাফ বাহারছড়া ইউপি চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ উদ্দিন ও মৌলভী রফিক উদ্দিনের বিরুদ্ধে ইয়াবা, মানবপাচার ও জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ২০১৬ সালের ৩০ জুলাই টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর এলাকার একটি রোহিঙ্গা বস্তি থেকে জঙ্গি সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারেটি অর্গানাইজেশনের (আরএস) এর নেতা, সৌদি নাগরিকসহ ৪ জনকে আটক করেছিল বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ(বিজিবি) সদস্যরা। ওই সময়ের সরকারদলীয় সাংসদ আবদুর রহমান বদি, তৎকালিন উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদ, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভী রফিক উদ্দিন এবং বাহারছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ উদ্দিন সহ অনেকে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জঙ্গি বৈঠক থেকে পালিয়ে যান। পরে আটক সৌদি নাগরিক সহ মৌলভী আজিজ উদ্দিন ও মৌলভী রফিক উদ্দিন সহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে টেকনাফ থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

২০১৮ সালের ৪ মে থেকে মাদক বিরোধী অভিযানে পালানোর কোন পথ না পেয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ১০২জন মাদককারবারি আইনশৃংখলা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করলেও আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গল দেখিয়ে ধরাছোয়ার বাইরে চলে যায় মৌলভী আজিজ উদ্দিন ও মৌলভী রফিক উদ্দিন। কিন্তু, কিছুদিন যেতে না যেতেই রহস্যজনক কারণে প্রকাশ্যে আসেন এই দুইভাই। সম্প্রতি আইন শৃংখলা বাহিনীর তৎপরতায় ইয়াবাকারবার কিছুটা ঝিমিয়ে পড়লেও বেশীরভাগ এলাকায় এখনও চলছে ইয়াবার কারবার। মৌলভী আজিজ উদ্দিন ও মৌলভী রফিক উদ্দিনের নিয়ন্ত্রণে এখনও বড় বড় চালান সাগর পথে আসে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকায় নাম থাকা টেকনাফ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভী রফিক উদ্দিন। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেছেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকায় আমাদের নাম রয়েছে ঠিকই। কিন্তু, এসব বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত লিখিত আপত্তি জানিয়েছি। এটি আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন তিনি।

মৌলভী রফিক উদ্দিন নিজেকে নিরপরাধ দাবি করে আরো বলেন, ‘জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমাদের বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততার যে মামলাটি করা হয়েছিল, ওই মামলার সার্জশীট থেকে আমাদের অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। অপরদিকে বৃহস্পতিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে দুর্নীতিদমন কমিশনের একটি টিম আমার ভাই ও বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ উদ্দিনকে কথা বলার জন্য শহরে ঢেকে এনে কোন কারণ ছাড়াই আটক দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করেছে। এটি সম্পূর্ণ অন্যায়। কারণ, কোন ধরণের নোটিশ ইস্যু না করে একজন জনপ্রতিনিধিকে এভাবে আটক করা যায় না। আমরা উচ্চ আদালতে যাব’।

জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম-২ এর উপ-সহকারি পরিচালক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘মৌলভী আজিজ উদ্দিনকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের কারণে আটক করা হয়েছে। আমার উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষ যদি মনে করেন তাদের অন্যান্য সম্পদের প্রতিও অনুসন্ধান করতে পারেন। তবে এখনও কিছু বলা যাচ্ছে না।

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2019

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!