মোবাইল করিমের কোটি কোটি টাকার উৎস কি?

শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২০ | ১২:১০ অপরাহ্ণ | 2983 বার

মোবাইল করিমের কোটি কোটি টাকার উৎস কি?

প্রতারনা ও দুর্নীতিসহ নানা কেলেংকারির অভিযোগে কথিত রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ করিমের নাম এখন দেশব্যাপী আলোচিত। তার প্রতানার জাল বিস্তার পেয়েছিল দেশজুড়ে। প্রান্তিক পর্যায়েও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ‘সাহেদরূপী’ হাজারো প্রতারক আর কেলেংকারিতে নিমজ্জিত ব্যক্তির। যার বিপুল পরিমান অবৈধ অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাবে তটস্থ প্রান্তিক জনপদের সাধারণ মানুষ।
তেমনি এক ‘সাহেদের’ সন্ধান মিলেছে সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে। তার আসল নাম আব্দুল করিম (২৮)। তবে টেকনাফের মানুষজনের কেউ তাকে ওই নামে চিনে না। চিনে ‘মোবাইল করিম’ নামে। তার বাড়ী টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের পানছড়ি এলাকায়। সে ওই এলাকার মৃত সুলতান আহমদের ছেলে।
টেকনাফের স্থানীয় নানা পর্যায়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকার আর ১০ টি সাধারণ পরিবারের মতই ছিল ‘মোবাইল করিমের’ পরিবারও। তার পিতার ছিল সামান্য জমি-জমা। ওই জমিতে চাষাবাদ করেই জীবিকা নির্বাহ করতো তার পিতা। পৈত্রিকসূত্রে প্রাপ্ত সামান্য জমি-জমার মালিকও মোবাইল করিম।
আব্দুল করিম ( মোবাইল করিম ) ছাত্রজীবনে জড়িত ছিল ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সাথে। এক সময়ের শিবির ক্যাডার করিম এখন জামায়াত ইসলামীর রাজনীতির সাথে জড়িত। তবে উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির সঙ্গে তার রয়েছে ব্যক্তিগত সখ্যতা। এতে প্রশাসনের নানা স্তরের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গেও গড়ে উঠেছে তার আন্তরিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ। এ নিয়ে সুযোগ ঘটে তার অবৈধ অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব বলয়ের জাল বিস্তারের।
তবে মোবাইল করিমের আর্থিক উত্থান ও ক্ষমতার প্রভাব রীতিমত আতকে উঠার মত। কথিত বৈধ ব্যবসার আড়ালে সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান করিম মাত্র এক দশকের মধ্যেই মালিক বনে গেছে শত শত কোটি টাকার মালিক। শুধু তা-ই নয়, সে নামে-বেনামে এখন টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় শত শত একর ভূ-সম্পত্তিরও মালিক। টেকনাফ পৌরসভায় বিভিন্ন মার্কেট ও বিপনী বিতানে তার মালিকানায় রয়েছে অন্তত ৩০ টির বেশী দোকানপাট আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নিজ গ্রাম সাবরাং ইউনিয়নের পানছড়ি ও টেকনাফ পৌরসভাসহ বিভিন্ন এলাকায় তার মালিকানাধীন ৫ টি বিলাস বহুল বাড়ী এবং ব্যক্তিগত ৪ টি অফিসও।
টেকনাফের ‘সাহেদরূপী’ মোবাইল করিমের আর্থিক উত্থান ও সম্পদের মালিকানার অনুসন্ধান করতে গিয়ে বের হয়ে এসেছে চমকে যাওয়ার মত কাহিনী। অনেকটা গল্পের সেই হাসের সোনার ডিম পাড়ার মত। আর আর্থিক মালিকানার জন্য সিঁড়ি হিসেবে আনুকূল্য পেয়েছে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় সাবেক এক সংসদ সদস্যের। এতে অল্প-সময়ের ব্যবধানে মোবাইল করিম বনে যায় বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থের মালিক এবং ক্ষমতার প্রভাব-প্রতিপত্তির। এমন কি সাধারণ মানুষকে জমি কিনে নামজারি করতে দিনের পর দিনে ভোগান্তি পোহাতে হলেও করিমের জন্য তা একান্তই মামুলি বিষয়। দিনের ব্যবধানে তার কেনা জমির নামজারি হয়ে যায় অলৌকিক ক্ষমতাবলে। মূলত: স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্যের প্রচ্ছন্ন ক্ষমতার প্রশ্রয়ে মোবাইল করিমও বনে যায় প্রভাব-প্রতিপত্তির।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত ২০০৫ সালে টেকনাফ পৌর এলাকার দ্বীপপ্লাজা মার্কেটে ‘মোবাইল হ্যাভেন’ নামের দোকান দিয়ে মোবাইল করিম বৈধ ব্যবসা শুরু করে। মূলত: মোবাইল ব্যবসার আড়ালে বাংলাদেশের বিভিন্ন অপারেটরের সীম কার্ড ও ফোন সেট মিয়ানমারে ব্যাপক হারে পাচার করে আর্থিক উত্থানের শুরু। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু শহরে তার মালিকানাধীন রয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অপারেটরের ফোনের রিচার্জ সেন্টার। এরপর থেকে আর্থিক উত্থান নিয়ে তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
এছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নামে-বেনামে সীম কার্ড সরবরাহ এবং মিয়ানমারের বিভিন্ন ফোন কোম্পানীর সীম কার্ড পাচার করে আনে মোবাইল করিম।
আইন-শৃংখলা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, মোবাইল করিমের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিগত ২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তৈরী প্রতিবেদনে ১ হাজার ১৫১ জন ইয়াবা কারবারিদের তালিকায় তার নাম ৫৪২ নম্বরে ছিল। প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে হুন্ডি ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল।
এদিকে অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, মোবাইল করিম অবৈধ অর্থের উৎস বৈধতার রূপ দিতে কৌশলের অংশ হিসেবে শুরু নানা ব্যবসা। বর্তমানে সে বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক ও এজেন্ট। সে এখন টেকনাফের একে রবি-আজিয়াকাটা কোম্পানীর সাব-ডিলার, গ্রামীণফোনের ডিলার, সিম্পনী ফোনের ডিলার, বিকাশের এজেন্ট ও ইউনিলিভার কোম্পানীরও এজেন্ট।
এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বনতে গিয়ে মোবাইল করিম ব্যবহার করেছে ক্ষমতার প্রভাব-প্রতিপত্তিও। টেকনাফের বিকাশ এজেন্ট ব্যবসা করায়ত্ত¡ করতে গিয়ে ক্ষমতার প্রভাব খাটায় সে। টেকনাফ পৌরসভার জালিয়াপাড়ার মোহাম্মদ আলী নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে সে অংশদারী ভিত্তিতে ব্যবসা শুরু করেছিল। এতে ২৫ শতাংশের মালিকানা ছিল মোহাম্মদ আলীর। পরবর্তীতে নানাভাবে হয়রানির মাধ্যমে তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করে মোবাইল করিম। মোহাম্মদ আলী দেশ থেকে পলাতক হওয়ার পর পুরো বিকাশ এজেন্টের মালিক বনে সে।
মোবাইল করিমের বিপুল পরিমান অবৈধ অর্থে মালিক ও প্রভাব-প্রতিপত্তি সম্পর্কে বলতে গিয়ে টেকনাফ পৌর এলাকার বাসিন্দা ও বিএনপি নেতা রেজাউল করিম রাজু বলেন, মোবাইল করিম টেকনাফের আরেক ‘সাহেদ করিম’। নানা ধরণের প্রতারণা ও কেলেংকারিতে জড়িত মোবাইল করিম এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় সে শত শত একর জমির মালিক। মোবাইল করিম বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের এজেন্টের পাশাপাশি টেকনাফে তার মালিকায় রয়েছে ৩০ টির বেশী দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
বিলাস বহুল জীবনযাপনের কথা উল্লেখ করে টেকনাফের এ বিএনপি নেতা বলেন, নিজগ্রাম ও টেকনাফ পৌর এলাকায় মোবাইল করিমের রয়েছে ৫ টি বিলাস বহুল বাড়ী এবং ৪ টি ব্যক্তিগত অফিস। ব্যবহার করে কোটি টাকা মূল্যের পাজেরো গাড়ী। কোথাও যাতায়তের সময় মোবাইল করিমের গাড়ীর আগে-পিছে পাহারায় থাকে ২০/৩০ টি মোটর সাইকেল আরোহী যুবকের।
এমন কি মোবাইল করিমের যে কোন ধরণের অনৈতিক কাজে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় সাবেক এক সংসদ সদস্যের প্রচ্ছন্ন আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকার কারণে ক্ষমতা প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটায় বলে অভিযোগ রেজাউল করিম রাজুর।
এদিকে মোবাইল করিমকে ছাত্র শিবিরের সাবেক ক্যাডার ও জামায়াত নেতা দাবি করে টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ননুরুল বশর বলেন, স্থানীয় সাবেক সাংসদ আব্দুর রহমান বদির ছত্রছায়ায় টেকনাফের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে মোবাইল করিম এখন কোটি কোটি টাকার পাশাপাশি বেশ কিছুসংখ্যক গাড়ী-বাড়ীর মালিক বনে গেছে। এমন কি ওই সাবেক এমপির সুপারিশে সে অস্ত্রের লাইসেন্সও পেয়েছে। এখন সেই অস্ত্র ব্যবহার করছে আওয়ামী লীগের ত্যাগী-নিষ্ঠাবান নেতাকর্মিদের হামলার ঘটনায়।
নানা প্রতারনা ও কেলেংকারিতে জড়িত টেকনাফের এ মোবাইল করিম ভবিষ্যতে জাতীয়ভাবে আলোচিত ‘সাহেদ করিমকে’ও হারমানাবে মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের এ নেতা বলেন, “ আইন-শৃংখলা বাহিনী মোবাইল করিমকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অজানা অনেক রহস্য বের হয়ে আসবে। ”
তবে তার ( মোবাইল করিম ) বিরুদ্ধে আনা সবধরণের অভিযোগ অস্বীকার করেন আব্দুল করিম।
করিম বলেন, আমি একজন সফল ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা। বর্তমানে টেকনাফ বাস স্টেশন ব্যবসায়ি কল্যান সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছি। মোবাইল হ্যাভেন নামের দোকানটির মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করলেও গত ১৬ বছরে আমি একজন সফল ব্যবসায়ি হিসেবে প্রতিষ্টিত হয়েছি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন ও মেরিন ড্রাইভ সড়কে আমার মালিকানাধীন বেশকিছু জমি-জমা অধিগ্রহণ হয়েছে। অধিগ্রহণ বাবদ প্রাপ্ত এবং রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে কোটি কোটি ঋণ নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করে প্রতিষ্টিত হয়েছি। ”
জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার আব্দুল করিম বলেন, আমার পিতা মরহুম সুলতান আহমদ জীবনদশায় আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিত কর্মি ছিলেন। আমার বড় ভাই ডাক্তার জামাল মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকায় ১৯৭১ সালে আমাদের বাড়ীঘর হানাদার বাহিনী পুড়িয়ে দিয়েছিল।
এখন একটি মহল আমার ব্যবসায়িক উত্থানে ঈর্ষান্বিত হয়ে নানা ধরণের অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, কে প্রতিষ্টিত ব্যবসায়ি; কে প্রতিষ্টিত ব্যবসায়ি নয় তা আমার জানার প্রয়োজন নেই। কারও বিরুদ্ধে যদি ইয়াবাসহ মাদক কারবারে সাথে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় তার বিরুদ্ধে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর।

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2020

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!