আবারো ফাঁদ পেতেছে দালাল চক্র

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছে রোহিঙ্গা ছলিমা

মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯ | ১২:৩৫ অপরাহ্ণ | 395 বার

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছে রোহিঙ্গা ছলিমা

ছলিমা খাতুন (১৯)। রাতের আধাঁরে দালালের ফাঁদে পা দিয়ে পাড়ি দিচ্ছিল সাগর। বিয়ের প্রলোভনে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তাদের। কিন্তু মালয়েশিয়া পৌঁছেছে বলে রাতের আঁধারে কক্সবাজার উপকুলের নুনিয়াছড়া এলাকায় সাগরে নামিয়ে দেয় দালাল চক্র। সেখান থেকে কুলে ফিরে ছলিমাসহ ১৭ রোহিঙ্গা।

সোমবার (২০ মে) কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর এমন তথ্য দিয়েছে ছলিমা খাতুন নামে এ রোহিঙ্গা নারী। সে টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মৃত আমান উল্লার মেয়ে। ৭ ভাই-বোনের মধ্যে ছলিমা খাতুন দ্বিতীয়। দুই ভাই এখনো ছোট।

ছলিমাদের সাথে আটক হয়েছে উখিয়ার থ্যাইংখালীর সি-১২ নং ক্যাম্পের দলু হোসেনের ছেলে আজিম উল্লাহ (২১)। তাকেও ভাল উপার্জনের চাকরীর কথা বলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।

আইনশৃংঙ্খলাবাহিনী বলছে, গত এক সপ্তাহে কক্সবাজার উপকূলে প্রায় ২ শতাধিক সাগরপথে মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গাদের আটক করা হয়েছে। তার মধ্যে, ১৭ মে রাতে পেকুয়া ও সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৃথক অভিযানে ৮৪ জন মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু আটক করে পুলিশ ও কোস্টগার্ড। এরমধ্যে ৬ জন দালাল আটক করা হয়। এরআগে, মহেশখালী উপজেলার হোয়ানক থেকে ২৯ জন, কালারমারছড়া থেকে ১৪ জন, পৃথক অভিযানে টেকনাফের বাহারছড়া থেকে ২০ জন ও মঙ্গলবার রাতে কক্সবাজারের দরিয়া নগর এলাকা থেকে ৩৪ জন। সবশেষ কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়া থেকে ১৭ জনকে আটক করা হয়। পাচারের সময় বেশিরভাগ ধরা পড়লেও কিছু কিছু আইনশৃখলা বাহিনীর অগোচরে সাগরপথে বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

একাধিক নির্ভযোগ্য সুত্র বলছে, কক্সবাজার মেরিনড্রাইভ সড়কের রেজু ব্রীজ এলাকায় গত ২০১৫ সালের মত আবারো সক্রিয় হয়েছে মানব পাচারকারী চক্র। সেই চক্রের ৬ সদস্যের নেতৃত্বে নেয়া হচ্ছে এসব রোহিঙ্গাকে। গত শুক্রবার রাতে পেকুয়া থেকে মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গা আটকের ঘটনায় জড়িত ১১ জন দালালকে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এরমধ্যে ৬ জন স্থানীয় উজানটিয়া এলাকার। তারা হলেন- মো. টিপু, আবদুল গণি, মো. মনছুর, মিজবাহ উদ্দিন, জসিম উদ্দিন ও আব্দুল কাদের। আর সেন্টমার্টিন থেকে মালয়েশিয়াগামী আটকের ঘটনায় ৫ জন দালালকে আটক করে কোস্টগার্ড। তারা হলেন- মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম এলাকার আমিন শরীফ (২৭), একই এলাকার মুহি উদ্দীন (৫১), আব্দুল খালেক (৩০), রামু উপজেলার রশিদ নগর সিকদার পাড়ার শওকত আকবর (৪৫) এবং একই এলাকার মো. মোবারক (৩২)। উভয় ঘটনায় মানবপাচার আইনে মামলা রুজু হয়েছে।

ছলিমা খাতুন বলেন, গত কয়েকদিন ধরে কিছু মানুষ আমার বাড়িতে গিয়ে বিভিন্নভাবে বলেছে কোন সমস্যা হবে না। সহজেই পার করে দেবে বলে ৫ হাজার টাকা করে নেয়। কিন্তু হঠাৎ করে গলা পানিতে নামিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায় তারা। সেখান থেকে অনেক কষ্টে কুলে আসি। সেখানে তারা (পুলিশ) আমাদের ধরে নিয়ে আসে।

আটক হওয়া আজিম উল্লাহ বলেন, ৬ হাজার টাকা নিয়েছে। তারপর ব্রীজের পাশ দিয়ে বোটে তুলে নিয়ে সাগরের কাছে ফেলে দেয়। সেখান থেকে সাঁতারে কুলে ফিরেছি। এখন শুধু ক্যাম্পে ফিরতে চাই। আর এ ভুল করবো না।

খতিজা বেগম বলেন, মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসার পর থেকে ইউসূফের সাথে আমার যোগাযোগ। তারপর দুই পরিবারের মতের ভিত্তিতে সম্প্রতি মোবাইলে বিয়ে হয় আমাদের। এরপর এক বড় ভাই বলছে আমাদেরকে সহজে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেবে। আমার স্বামীও একই কথা বলছে। সাগড় পাড়ি দিতে হবে সেটা জানতাম না। তবে বলছে যে অল্প সাগর পাড়ি দিতে হবে।

খতিজা আরও বলেন, কিছু দূর নেয়ার পর একটা এলাকায় নামিয়ে দেয়া হয় আমাদের। পরে আমরা কিছুই চিনতে পারছি না। এক পর্যায়ে পুলিশ আমাদের ধরে নিয়ে যায়।

একি সুরে কথা নুরুছাবা বেগমের কণ্ঠও। তবে তার কথাগুলো একটু ভিন্ন। নুরুচ্ছাবা বলেন, নয়নের সাথে পরিচয় বার্মা (মিয়ানমার) থাকতে। এরপর বাংলাদেশে চলে আসি আমরা। তার সাথে কিছুদিন যোগাযোগ বন্ধ ছিল সম্প্রতি এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তার সাথে আবারও যোগাযোগ হয়। পরে আমরা মোবাইলে বিয়ে করি। এখন তার কাছে যাচ্ছিলাম।
অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া কক্সবাজার সদর থানার উপ-পরিদর্শক দীপক কুমার বলেন, ‘নুনিয়াছড়া থেকে নারী সহ ১০ জন রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করা হয়েছে। সাগর পথে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেয়ার কথা বলে উখিয়া ক্যাম্প থেকে তাদের নিয়ে এসে নুনিয়াছড়া উপকুলে নামিয়ে দেয়া হয়।

এদিকে স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শহরের সাগরতীর নুনিয়াছড়া এলাকায় শীর্ষ মানব পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে শামসু মাঝির ছেলে ছৈয়দ করিম তার ভাই মোহাম্মদ করিম, গুরা মিয়া মাস্টারের ছেলে আবু বক্কর ও নতুন বাহারছড়া এলাকার মৃত হোসেনের ছেলে জাফর আলম শিপন। তাদের হাত ধরেই এ পথ ধরে বহুবার মানব পাচার হয়েছিল। চিহ্নিত এসব পাচারকারীর নামে বেশ কয়েকটি মানব পাচার আইনে মামলাও রয়েছে।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, পুলিশের তালিকাভুক্ত এসব পাচারকারী আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের হাত ধরে এসব রোহিঙ্গা নুনিয়াছড়া এলাকায় এসেছে বলেও জানা গেছে

এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদ উদ্দিন খন্দকার বলেন, অবৈধভাবে সাগর পথে পাচারের খবর পেয়ে পুলিশ ১০ জন রোহিঙ্গাকে নুনিয়াছড়া থেকে আটক করেছে। স্থানীয় একটি চক্র এসব পাচারে জড়িত রয়েছে। পুলিশ এবিষয়ে তদন্ত করে মামলার প্রস্তুতি চলছে।

কক্সবাজার পুলিশ সুপার (এসপি) এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, সীমানা প্রাচীর না থাকায় রোহিঙ্গারা সহজেই ক্যাম্প ছাড়তে পারছে। দ্রুত সীমানা প্রাচীর নির্মাণের জন্য সরকারের উচ্চ মহলে আবেদন পাঠাবে পুলিশ।

বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের স্টাফ অফিসার (অপারেশন) লে. কমান্ডার সাইফুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গা পাচার ঠেকাতে সাগরে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে কোস্টগার্ড। কক্সবাজার উপকুলের বিভিন্ন পয়েন্টে টহল বাড়ানো হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মানবপাচারের মামলা হয়েছে ৪৩৫ টি যার সবটাই এখনো বিচারাধীন। আর এক বছরে এরকম মামলায় আটক হয়েছে দশ জনেরও বেশী দালাল। মূলত দালালদের বিচার না হওয়ার কারণে এমন ঘটনা বার বার ঘটছে বলে অভিমত বিশিষ্ট্যজনদের।

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2020

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!