মাদকের শীর্ষ গডফাদার জিয়াউদ্দিন বাবুল এখনো অধরা

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯ | ৭:৪৫ অপরাহ্ণ | 684 বার

মাদকের শীর্ষ গডফাদার জিয়াউদ্দিন বাবুল এখনো অধরা

চকরিয়া পৌরসভা ৮নম্বর ও ৯নম্বর ওয়ার্ড মাদকপাড়া হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানের মুখে ইয়াবা কারবারিরা আড়ালে রয়েছে। তবুও বন্ধ হচ্ছে না ইয়াবার রমরমা বাণিজ্য। তেমনি চকরিয়া উপজেলা শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা নতুন কৌশলে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অদৃশ্য কারণে চকরিয়ার শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী এখনো নিরাপদে রয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযানে চকরিয়ার মাদক কারবারিদের আইনের জালে আটকানোর দাবি জানান সচেতন মহল।
চকরিয়া উপজেলায় শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে রয়েছে। এমন একজনের তথ্য এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকাভূক্ত শীর্ষ মাদক কারবারি জিয়া উদ্দিন বাবুল। চকরিয়া উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর করা তালিকায় তাঁর নাম অন্যতম। বাবলু চকরিয়া পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের পুকপুকুরিয়া সেমইশাপাড়া এলাকার মৃত সোলাইমানের পুত্র।

জিয়াউদ্দিন বাবুলের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় ইয়াবা, অপহরণ, অস্ত্র, ডাকাতির চেষ্ঠা, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ এক ডজন মামলা থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাহিরে রয়েছে। কিন্তু বাবুলের মতো বড় মাপের ইয়াবা কারবারি গ্রেপ্তার না হওয়ায় চকরিয়ার সচেতন মানুষ হতাশ। সারা দেশে এত কঠোর অভিযানের মুখেও কেমন করে বাবুলের মতো ইয়াবা কারবারি পার পেয়ে যাচ্ছে এমন প্রশ্ন সচেতন মহলের।

সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদক বিরোধী অভিযানে এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, দেশের শীর্ষ ইয়াবা কারবারি সাইফুল করিমের মতো ইয়াবার মুল ডিলার বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়েছে। কিন্তু চকরিয়ায় কোন শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। যারা ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে গত বছর চকরিয়ার শীর্ষ ফেন্সিডিল ব্যবসায়ী ইসমাইল বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চকরিয়ার শীর্ষ মাদক কারবারি জিয়াউদ্দিন বাবুলের ইয়াবাসহ প্রায় ১০টি মামলা রয়েছে। তাঁর মধ্যে ৫টি ইয়াবার মামলা রয়েছে। দেশের অসংখ্য থানায় পুলিশের হাতে আটক হওয়া ইয়াবা বাবুলের বলে গ্রেপ্তারকৃত প্রচারকারী পুলিশের কাছে জবানবন্দিতে স্বাকীর করেছে। ২০১৮সালের ফেব্রুয়ারির ৬তারিখ চট্টগ্রাম জেলার পাহাড়তলী থানায় চকরিয়া পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের রাজধানী পাড়ার সালেহ আহমদের পুত্র মনজুর আলম (৪৫) ১০হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়। বর্তমানে মনজুর চট্টগ্রাম জেলা কারাগারে রয়েছে। পুলিশের জবানবন্দিতে ওই ১০হাজার ইয়াবা জিয়াউদ্দিন বাবুলের বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করে তাঁর সহযোগী মনজুর। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যায় বাবুল। অভিযোগপত্রে জিয়াউদ্দিন বাবুলকে মামলায় অন্তর্ভক্ত করা হয়।

২০১৭সালের জুলাইয়ের ২তারিখ চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী থানার মইজ্যারটেক এলাকায় চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (বন্দর পশ্চিম) একটি টিম বাবুলের অন্যতম সহযোগী চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নের নুর আহমদের পুত্র মো. নেজাম উদ্দিন (৪০) কে ১০হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে। গোয়েন্দা পুলিশ নাজেমকে গ্রেপ্তার করার পর বাবুল পালিয়ে যায়। গোয়েন্দা পুলিশের জবানবন্দীতে নেজাম উদ্দিন স্বীকার করে আটককৃত ইয়াবা জিয়াউদ্দিন বাবুলের। গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) সজল কান্তি দাশ বাদি হয়ে কর্ণফুলী থানায় মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করে।

২০১৫সালের জুনের ২৫তারিখ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মুন্সীগঞ্জ জেলার গজালিয়া থানায় আনারপুরা সাকিলস্থ জে.এস.আই পেট্রোল পাম্পের পাশে পুলিশের চেকপোষ্টে একটি মোটরসাইকেলসহ দুই হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পুলিশ মোটরসাইকেলের মালিকের সন্ধানে নামে। পরে পুলিশ বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি(বিআরটিএ) কাছে আবেদন করলে মোটরসাইকেলটি চট্টগ্রামের এক ব্যক্তি থেকে চকরিয়া জিয়াউদ্দিন বাবুল কিনে বলে জানায়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগপত্রে তাঁর নাম উঠে আসে।

২০০৯সালের জুনের ৫তারিখ কক্সবাজার পৌরসভার হাশেমিয়া মাদ্রাসার পূর্ব পাশে নুর মোহাম্মদ আনচারী ভাড়া বাসার মো. নুর নামের এক ভাড়াটিয়াকে অপহরণ করে জিয়া উদ্দিন বাবুলের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী। এঘটনায় বাড়ির মালিক বাদি হয়ে কক্সবাজার সদর থানায় অপহরণের পর হত্যা চেষ্ঠার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করে।
২০১৬সালের জুলাইয়ের ৬তারিখ চকরিয়া পৌরসভার দিগরপানখালী এলাকার এহেসানুল হক নামের এক যুবক এলাকায় জিয়াউদ্দিন বাবুলের ইয়াবা ব্যবসা বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। এতে বাবুল ক্ষিপ্ত হয়ে এহেসানের তিনটি দোকান-ঘর পড়িয়ে দেন। পরে এহেসানুল হক বাদি হয়ে জিয়াউদ্দিন বাবুলকে আসামী করে চকরিয়া থানায় মামলা দায়ের করে।

২০১৬সালের এপ্রিলের ২৫তারিখ চকরিয়া পৌরসভার ভাঙারমুখ এলাকায় জিয়াউদ্দিন বাবুলের নেতৃত্বে নাছির উদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ীকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালায়। এসময় বাবুল ৪-৫রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে এলাকা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। পরে ব্যবসায়ী নাছির উদ্দিন বাদি হয়ে চকরিয়া থানায় বাবুলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।
নানা ঘটনার সূত্রপাত হওয়ার পরও জিয়াউদ্দিন বাবুলের ইয়াবা ব্যবসা থামেনি। একইভাবে চকরিয়া পৌরসভা ৯নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম বাবুলের ইয়াবা ব্যবসা বন্ধে তাঁর বিরুদ্ধে এলাকায় অবস্থা নেন। এতে বাবুল কাউন্সিলর নজরুলের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। পরে বাবুল ১০-১৫জন ভাড়াটিয়া কিলার নিয়ে নজরুলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে তাকে প্রকাশ্যে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে হত্যার চেষ্ঠা করে। পরে ঘটনা ২৪ঘন্টার ভিতর পুলিশের তৎপরতায় কাউন্সিলর নজরুলকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। পরে নজরুল বাদি হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে থানায় মামলায় দায়ের করে।
চলতি বছরের জানুয়ারি ১৫তারিখ কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সামনে আল-জিয়া ও আল মাহমুদের কটেজের সামনে অবৈধ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ডাকাতির প্রস্তুতি নেন।

এসময় পুলিশের তৎপরতায় ডাকাতি ভন্ডুল হয়। পরে কক্সবাজার সদর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) দেবব্রত রায় বাদি হয়ে থানায় ডাকাতির প্রস্তুতি ও অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করে। ওই মামলার এজাহারভুক্ত অন্যতম আসামী বাবুল। ২০১৮সালের জুনের ২১তারিখ চকরিয়া পৌরসভার কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ব্যবসায়িক কাজে কক্সবাজার জেলা শহরে যায়। এসময় বাবুল পুনরায় অপহরণের চেষ্ঠা করে। পরে চকরিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রিট আদালতে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে বাদি হয়ে সাধারণ ডায়েরী দায়ের করে। এছাড়াও তাঁর বিরুদ্ধে আরো একটি নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা রয়েছে।

ইয়াবা ব্যবসায় উত্থান : জিয়াউদ্দিন বাবুল। চকরিয়া পৌরসভার পুকপুকুরিয়া সেমইশাপাড়া এলাকার মৃত সোলাইমানের পুত্র। জীবিকার তাগিদে সৌদিআবরে পাড়ি যামান। নিয়মিত দেশে আসা-যাওয়া ছিল। ২০১২সালের দিকে দেশে ফিরে আর সৌদি আবরে ফিরে যাননি। অল্প সময়ে জড়িয়ে পড়েন ইয়াবা ব্যবসায়। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেন। দেশের বিভিন্ন থানায় বাবুলের বড় বড় চালান ধরা পড়লেও তিনি পর্দার আড়ালে থেকে যান। ইয়াবা ব্যবসা জোরে রাতারাতি গাড়ি-বাড়ির মালিক বনে যায়। এরপর পিছনে থাকাতে হয়নি বাবুলকে। ইয়াবার টাকায় নিজেকে স্বপ্নের মতো সাজিয়ে নিয়েছেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, জিয়াউদ্দিন বাবুল চকরিয়ার শীর্ষ ইয়াবা কারবারি হলেও এত দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আড়ালে রয়ে গেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান এড়াতে নিয়মিত অবস্থান বদল করে। জিয়াউদ্দিন বাবুলের চকরিয়া পৌরসভার নিজ জন্মস্থান সেমইশাপাড়া ছাড়াও কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে ভাড়া বাসা রয়েছে। এক জায়গা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালে অন্য জায়গায় অবস্থান নেন। কৌশলী জিয়াউদ্দিন বাবুল এভাবে দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে আসছে। বেশ কয়েকবার র‌্যাব ও পুলিশ তাঁর চকরিয়া পৌরসভার সেমইশাপাড়ার বাড়িতে অভিযান চালালেও তাকে না পাওয়ায় গ্রেপ্তার করতে সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর বাড়ি র‌্যাব ২০১৬সালের দিকে অবৈধ আগ্রেয়াস্ত্র উদ্ধার করে।

চকরিয়া পৌরসভাবাসীর অভিমত, বাবুল অল্প সময়ে এত টাকা মালিক বনে যাওয়ার উৎস কোথায়! আরো নানা কথা। তাদের সম্পদের বিষয়ে তদন্তে নামার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) হস্তক্ষেপ কামনা করছেন এলাকার সচেতন মহল। তবে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে চকরিয়ার শীর্ষ ইয়াবা কারবারি হিসেবে নাম উঠে এসেছে। কয়েকজন গডফাদারের নামও আছে ওই তালিকায়। সংস্থাগুলোর তালিকায় তাদের অনেক সহযোগীদের নামও রয়েছে।
প্রথমে কথা বলতে রাজি না হলেও পরবর্তীতে চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, আমি কথায় বিশ্বাসী নয় কাজে বিশ্বাসী। তাকে পেলেই আমি গ্রেফতার করবো। শুধু সে নয় যে কোন মাদক ব্যবসায়ীকে কোনভাবে ছাড় দেয়া হবে না।

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2020

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!