মহেশখালীর ৮৮ সাইক্লোন শেল্টারের মধ্যে ৩৩ ঝুকির্পূণ

সোমবার, ২৯ এপ্রিল ২০১৯ | ১২:০৭ অপরাহ্ণ | 442 বার

মহেশখালীর ৮৮ সাইক্লোন শেল্টারের মধ্যে ৩৩ ঝুকির্পূণ

দুর্যোগের মৌসুম এলে বাড়ি বদলের হিড়িক পড়ে যায় উপকূল জুড়ে। এক ধরণের নিরব আতংক। যেটা চোখে দেখা যায় না। তবে আতংকগ্রস্থ মানুষের ছুঁটাছুঁটি দেখে বিষয়টি সহজেই অনুমান করা যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের তাড়া খেয়ে যুগযুগে গড়ে ওঠা পুরানো বাড়িগুলো সরিয়ে নিতে হয় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। ঝড়-ঝাপটা বিপন্ন-বিধ্বস্ত বহু মানুষ। তবুও নি:স্ব মানুষেরা আবার স্বপ্ন দেখে বাঁচার, ঘর বাঁধার। এখন এমনই এক আতংকের সময়ের মধ্যে রয়েছে জেলার উপকূলবাসী। সময়টাকে বলা হয় ডেঞ্জার পিরিয়ড। বহু মানুকে কাঁদিয়ে এ সময়টি বারবার আসে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা উপজেলাবাসী কতটা প্রস্তুত হতে পারছি ঝুঁকির সময়ের জন্য ? ১৯৯১ সালের ভয়াল সেই ২৯ শে এপ্রিল। আজকের এই দিনে উপকূলের হাজার হাজার নর নারীর সলিল সমাধি হয়েছে। এই ভয়াল দিনকে স্বরণ করতে মহেশখালীতে উন্নয়ন পরিষদ এর আয়োজনে বড় মহেশখালীতে এক স্বরণ সভার আয়োজনা করা হয়েছে।

সরজমিন পরির্দশন করে দেখা গেছে, জেলার একমাত্র দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীতে ঘূর্নিঝড় কালিন সময়ে আশ্রয় গ্রহন করার জন্য যে সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে তা খুবই অপ্রতুল্য, তার মধ্যে সরকারী হিসাব মতে ৮৮টি আশ্রয় কেন্দ্রের মধ্যে ৩৩টি ব্যবহারের অনুপযোগি। আবার যা ব্যবহারের উপযোগি তা প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে বেশ কিছু আশ্রয় কেন্দ্র। অনেকেই আবার উক্ত আশ্রয় কেন্দ্রে নিজদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছে।

সাইক্লোন শেল্টার আর বেড়িবাঁধগুলো দায়সারাভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়ায় অনেক স্থানে অবৈধ দখলেও চলে গেছে। এগুলি পুনঃ উদ্ধারে প্রশাসনের তৎপরতা নেই। দূর্যোগকালের ব্যবহারের জন্য গড়া সাইক্লোন শেল্টারগুলোর অধিকাংশ এখন ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করছে স্থানীয় জনগণ। সাইক্লোন শেল্টারের চাহিদা পূর্ণ এলাকার মধ্যে সরইতলা, নতুন ঘোনা, সাপমারার ডেইল ও রাজাখালী এলাকায় বেড়িবাঁধের অবস্থা করুণ বলে জানান স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান কামরুল হাসান।

তিনি জানান, এখানে আরো কমপক্ষে চারটি সাইক্লোন শেল্টার ও সাপমারার ডেইল ঘাটে একটি জেটি নির্মাণ প্রয়োজন। অপরদিকে স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ বিগত সময়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণে বড় ধরনের লুটপাটের কারণে এখানে সরকারি কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের পরেও একটি টেকসই বাঁধ গড়ে উঠছেনা।

বর্ষপঞ্জির হিসেবে, ১৫ মার্চ থেকে ঝড়ের মৌসুম শুরু হয়ে শেষ হয় ১৫ অক্টোবর। এই সাত মাস বিভিন্ন ধরণের দুর্যোগের মুখোমুখি হয় উপকূলের মানুষ। এই সময়ে বহু দ্বীপ-চর পানিতে ডুবে থাকে। জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নেয় বাড়িঘর। বহু মানুষ গৃহহারা হয়ে বাঁধের পাশে ঠাঁই নেই। ঘূর্ণিঝড়ের সিগন্যাল প্রচারে সরকার যেভাবে তৎপর, নদীভাঙণ ও জলোচ্ছ্বাসের ভয়াবহতা কমাতে সে ধরণের সরকারি উদ্যোগ চোখে পড়ে না। দুর্যোগের সিগন্যাল প্রচারের চেয়েও এটা জরুরি। নদীভাঙণের নিরবে বহু মানুষ সর্বস্ব হারাচ্ছে। পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এই ভয়াবহতা আমরা সেভাবে চোখে দেখি না। বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। স্থানান্তরিত প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প হতে উচ্ছেৎ হওয়ার মানুষের খবর রাখা সরকারের উচিৎ।

প্রতিটি মানুষের স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সঙ্গে ঝুঁকি হ্রাসের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দুর্যোগে বারবার লন্ডভন্ড হলে স্বাভাবিকভাবে বাঁচার কোন সুযোগ থাকে না। তাছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুর্যোগ ঝুঁকি কমিয়ে আনা জরুরি। দুর্যোগে যে শুধু ঘরবাড়ি কিংবা জমিজমা হারিয়ে যায় তা নয়, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যপক ক্ষতি হয়। এই প্রাকৃতিক সম্পদও বহু মানুষের জীবিকার প্রধান মাধ্যম। উপকূলে এই ডেঞ্জার পিরিয়ডে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, জলাবদ্ধতা, ভাঙণসহ বিভিন্ন ধরণের দুর্যোগ আসে। পরিসংখ্যান বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই দুর্যোগের মাত্রা আগের চেয়ে বেড়েছে। অন্যান্য মৌসুমে দুর্যোগের তেমন ভয় না থাকলেও ডেঞ্জার পিরিয়ডে উপকূলবাসীকে তাই আতংকেই কাটাতে হয়। নানা ধরণের উদ্যোগ নিয়েও ক্ষতি কমিয়ে আনা কিংবা আতংক নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে না। ঠিক ৩০ বছর আগে উপকূলের মানুষ যেভাবে আতংকগ্রস্থ ছিলেন এখনও সেভাবেই আছে। তাদের জীবন ততটা নিরাপদ হয়েছে বলে মনে হয় না।

রাষ্ট্রীয় পলিসি, নীতিমালা কিংবা আইনকানুন লেখার সময় প্রান্তিক মানুষের ঝুঁকি হ্রাসের বিষয়গুলো লিপিবদ্ধ করা হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের কথাও উল্লেখ থাকে। যেমনটা ২০০৫ সালে প্রণীত উপকূলীয় অঞ্চল নীতির কথাই ধরা যাক। ওই নীতির ৪ দশমিক ৩ ধারায় ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এই ধারার কয়েকটি বিষয় এরকম, ক) দারিদ্র্য হ্রাসের জাতীয় কৌশলের অংশ হিসাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংক্রান্ত ঝুঁকি হ্রাসের ওপর গুরুত্ব দেয়া; (খ) উপকূলীয় অঞ্চলকে বিবেচনায় এনে সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় সাধন করা; (গ) দুর্যোগকালে দরিদ্রদের দুর্যোগ মোকাবেলার ক্ষমতা বাড়ানোর কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন করা ও তাদের সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য বীমা পদ্ধতি চালু করা; (ঘ) নদীভাঙণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করা এবং নদীভাঙা মানুষের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা; (ঙ) দুর্যোগকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, বহুমূখী ব্যবহার উপযোগী বাঁধ, কিল্লা, রাস্তাঘাট ও দুর্যোগ সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সমন্বয় করা; চ) জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলায় প্রাথমিক কার্যক্রম হিসাবে বাঁধগুলোর নিয়মিত রক্ষাবেক্ষণ ও বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী বনায়ন করা ইত্যাদি।

দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে উপকূল অঞ্চল নীতিমালার এই কয়েকটি বিষয়ের দিকে চোখ রাখলেই অনুধাবন করা যায়, কাগজে ঠিকঠাক মানুষের নিরাপদে বসবাসের কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে রয়েছে এর সামান্যই। উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলোর মধ্যে অনেকগুলোই কার্যত নীতিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। জলোচ্ছ্বাসে বাড়িঘর ভেসে যাওয়ার পর পূনরায় বাড়ি করতে সহায়তার খবর খুব কমই পাওয়া যায়। একইভাবে নদীভাঙণে বাড়িঘর হারানো মানুষের জন্য সহায়তার পরিমাণ সামান্যই। যে বেড়িবাঁধ উপকূলবাসীকে নিরাপত্তা দেয়, সে বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দ থাকে না। পক্ষান্তরে গ্রামের পর গ্রাম ভেঙে যাওয়ার পর আসে বরাদ্ধ। আবার সে বরাদ্দের কাজ শুরু হতে হতে বিলীন হয় আরও কয়েকগ্রাম। এই হলো আমাদের উপকূলের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রমের চিত্র। সে ক্ষেত্রে প্রতিবছর দুর্যোগ মৌসুম উপকূলবাসীর জন্য আতংক নিয়ে আসবে, এটাই তো স্বাভাবিক।

নতুন কিছু করার প্রয়োজন নেই। নীতিতে যা আছে, আইন যতটা অনুমোদন দিয়েছে, ততটুকুই করুন। তাতেই উপকূলবাসীর কল্যাণ হবে। অন্যন্ত দুর্যোগ মৌসুমে কান্নার শব্দ খানিকটা হলে কমে আসবে।

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2020

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!