বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ঘিরে দালাল চক্র সক্রিয়

শনিবার, ০৬ জুলাই ২০১৯ | ৮:৩০ অপরাহ্ণ | 315 বার

বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ঘিরে দালাল চক্র সক্রিয়

বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও প্যাথলজির সঙ্গে যোগসাজশ পূর্বক গড়ে উঠা একটি দালাল চক্র সাধারণ রোগীদের উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করে চলছে।

এতে উন্নত চিকিৎসার নামে নিম্নমানের হাসপাতাল-ক্লিনিক ও প্যাথলজি সেন্টারে চিকিৎসা এবং রোগ-নির্ণয় পরীক্ষা প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ রোগীরা; এমনটি অভিযোগ সচেতন মহলের।
দালাল চক্রটির সদস্যরা কক্সবাজার সদর হাসপাতাল কেন্দ্রিক রোগীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত এ প্রতারণা অব্যাহত রাখলেও সংশ্লিষ্টদের এ নিয়ে কোন ধরণের ভ্রুক্ষেপ নেই।

এ নিয়ে হাসপাতাল প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিষয়টি তারাও শুনেছেন। প্রতারণায় জড়িতদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। প্রতারক চক্রের লোকজনকে চিহ্নিত করা গেলেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সরেজমিন কক্সবাজার সদর হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালের বহি:র্বিভাগের বিভিন্ন বিভাগ সংঘবদ্ধ দালাল চক্রের বেশ কয়েকজন ব্যক্তি কর্মচারী বেশে চিকিৎসকের কাছে পরামর্শ নেয়া রোগীদের সঙ্গে সহায়তার নামে কথা বলতে। তাদের কেউ কেউ রোগীদের কাছে হাসপাতালের কর্মচারী পরিচয় দিতেও দেখা গেছে। সহায়তার নামে ভাব জমায় রোগীদের সঙ্গে।
কয়েকটি রোগ-নির্ণয় পরীক্ষা হাসপাতালে করার ব্যবস্থা থাকলেও অধিকাংশেরই ব্যবস্থা নেই। এতে পরামর্শ নেয়া রোগীরা হাসপাতালে ব্যবস্থা না থাকা রোগ-নির্ণয় পরীক্ষাগুলো বেসরকারি ক্লিনিক ও প্যাথলজি সেন্টারে করতে বাধ্য হন। এটিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে দালাল চক্রের সদস্যরা রোগীদের ফুঁসলিয়ে নিয়ে যায় চুক্তিবদ্ধ ক্লিনিক ও প্যাথলজিগুলোতে।

মূলত: কমখরচে উন্নত চিকিৎসা ও পরীক্ষার কথা বলে দালালেরা এসব রোগীদের চুক্তিবদ্ধ ক্লিনিক ও প্যাথলজিতে নিয়ে যেতে পারলে পায় নির্ধারিত হারের কমিশন। সেই কমিশনটি আবার নির্ভর করে রোগীর চিকিৎসা ও রোগ-নির্ণয় বাবদ টাকার অংকের উপর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিটি রোগীর চিকিৎসা ও রোগ-নির্ণয় বাবদ আসা টাকার অংকের উপর দালাল চক্রের সদস্যরা ২০ শতাংশ হারে কমিশন নিয়ে থাকে। অন্যদিকে নি¤œমানের ক্লিনিক ও প্যাথলজি থাকলে কমিশনের হারও বেশী হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বাণিজ্য করে দালালেরা।

কক্সবাজার সদর হাসপাতাল কেন্দ্রিক বিভিন্ন স্তরের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, আব্দুস সালাম, আব্দুর শুক্কুর, সলিম উল্লাহ, মো. মোসলেম, ও মো. আব্দুল্লাহ সহ অন্তত ১০ জনের বেশী দালাল চক্রের সদস্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের বহির্:বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত এ প্রতারণা বাণিজ্য করে চলছে। হাসপাতালের কতিপয় কর্মচারীও দালাল চক্রের সদস্যদের সঙ্গে যোগসাজশ গড়ে তোলায় কমিশন বাণিজ্য কোনভাবেই থামানো যাচ্ছে না।
মূলত: হাসপাতাল সড়ক ও খানেখাহ জামে মসজিদ সড়ক সহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আশপাশে গড়ে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও প্যাথলজিগুলোকে কেন্দ্র করেই দালাল চক্রের লোকজন চিকিৎসা সেবা ও রোগ-নির্ণয় পরীক্ষার নামে এ কমিশন বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষ করে হাসপাতাল সড়কের কেন্দ্রিয় জামে মসজিদ সংলগ্ন পপুলার ইনভেস্টিগেশন সেন্টার, এ্যাকোরা ব্লাড ব্যাংক ও ট্রান্সফিউশন সেন্টার, আল-সামী মেডিকেল সেন্টার, কক্স ন্যাশনাল হাসপাতাল, সী-সাইড হসপিটাল, সিআইসি এবং জেনারেল হাসপাতাল সহ আরো কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিক ও প্যাথলজি সেন্টারে প্রতিনিয়ত চলছে দালাল চক্রের কমিশন বাণিজ্য।
এদের মধ্যে পপুলার ইনভেস্টিগেশন সেন্টার, এ্যাকোরা ব্লাড ব্যাংক ও ট্রান্সফিউশন সেন্টার, কক্স ন্যাশনাল হাসপাতাল ও আল-সামী মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসা সেবা এবং রোগ-নির্ণয় পরীক্ষার নামে চলছে গলাকাটা বাণিজ্য। দালালেরা কোন মতে একজন রোগীকে নিয়ে যেতে পারলেই পকেটভারী নিশ্চিত।

এদের মধ্যে কক্স ন্যাশনাল হাসপাতালে প্রথমে রোগী ভর্তির নামে জমা বাবদ আদায় করে ৫ হাজার টাকা। রোগীকে হাসপাতালে রাখার প্রয়োজন না পড়লেও কৌশলে রেখে দিয়ে চিকিৎসক ফি, সিট বা কক্ষ ভাড়া এবং সেবার নামে গলাকাটা বিল আদায় করা এক প্রকার নিয়মে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে খুবই সচতুর ও ধুরন্ধর প্রকৃতির এসব দালালদের প্রতিদিন হাসপাতালে আনাগোনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ নিয়ে কোন ধরণের ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় এমনটি অভিযোগ কক্সবাজারের সচেতন মহলের।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের নেতা ছৈয়দ করিম বলেন, কক্সবাজারের চিকিৎসা পরিসেবার বড় ধরণের প্রতিষ্ঠান ‘সদর হাসপাতাল’। এটি জেলার গরীব ও অসহায় মানুষের জন্য জটিল ধরণের চিকিৎসা পাওয়ার একমাত্র ভরসাস্থল। অথচ এ প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে সংঘবদ্ধ দালাল চক্রের লোকজন কমখরচে ও উন্নত চিকিৎসার সুবিধার কথা বলে প্রতিনিয়ত প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “ দালাল চক্রের সদস্যরা চুক্তিবদ্ধ ক্লিনিক ও প্যাথলজি সেন্টারগুলোর সাথে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে এ ধরণের প্রতারণা করছে। হাসপাতাল প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রতিদিনই এ প্রতারণা চালিয়ে গেলেও কোন ধরণের ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। ”
দ্রুততার সঙ্গে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত লোকজনকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান নাগরিক আন্দোলনের নেতা ছৈয়দ করিম।

এদিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতাল কেন্দ্রিক একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র সক্রিয় থাকার তথ্যের কথা স্বীকার করেছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা: মোহাম্মদ মহিউদ্দিন।
ডা: মহিউদ্দিন বলেন, সম্প্রতি হাসপাতাল কেন্দ্রিক গড়ে উঠা চক্র সাধারণ রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করে বিভিন্ন সেবরকারি ক্লিনিক ও প্যাথলজিতে নিয়ে যাওয়া খবর শুনেছেন। সরকারি দু’য়েক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও বিষয়টি অবহিত করেছেন। এ নিয়ে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণাকারি লোকজনকে চিহ্নিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
প্রতারণাকারি লোকজনকে চিহ্নিত করা গেলেই তাদের শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান হাসপাতালের এ তত্ত্বাবধায়ক মহিউদ্দিন।

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2020

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!