এইমাত্র পাওয়া

x

ঝুঁকিতে মাইক্রোওয়েভ স্টেশন

বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের নামে শত কোটি টাকার জমি দখল

মঙ্গলবার, ০৬ আগস্ট ২০১৯ | ২:০২ অপরাহ্ণ | 240 বার

বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের নামে শত কোটি টাকার জমি দখল

বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে কক্সবাজারের কলাতলীর মাইক্রোওয়েভ স্টেশনের শত কোটি টাকা মুল্যের জমি দখলে নিয়েছে একটি প্রভাবশালীমহল। প্রশাসনের বার বার নির্দেশনা থাকা সত্বেও রাতের আঁধারে শত শত শ্রমিক দিয়ে এসব জমি দখলে নিয়েছে ওই প্রভাবশালী চক্র। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন লায়ন মুজিবুর রহমান নামের এক ব্যক্তি।

অভিযোগ উঠেছে, কলাতলী মাইক্রোওয়েভ স্টেশনের চারপাশে পাহাড় কেটে জায়গা জবর দখল করে নিয়েছে ওই প্রভাবশালী চক্র। সেখানে ইতিমধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ স্থাপনা। ‘টিএন্ডটি পাহাড়’ হিসেবে পরিচিত এই পাহাড় কেটে সমতল করায় ৮৩ ফুট উচ্চতার টাওয়ারসহ স্টেশনের দালান ধসে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। এতে করে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ এ স্থাপনা।
১৯৭৬ সালে বনবিভাগের ৫.৬ একর জমিতে মাইক্রোয়েভ স্টেশনটি স্থাপন করা হয়। বর্তমানে স্টেশনটিতে জনসাধারণকে টেলিকম সেবা প্রদানের জন্য ৮৩ মিটার উঁচু একটি টাওয়ার রয়েছে। টাওয়ারে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন টেলিকম অপারেটর এবং গোয়েন্দা সংস্থার রেডিও এন্টেনা বসানো আছে। এ টাওয়ারেই ‘মহেশখালী ডিজিটাল আইল্যান্ড’ প্রকল্পের এন্টেনা বসানো হয়েছে। এটি যে কোন সময় অকেজো হলে পুরো দেশের সাথে কক্সবাজার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে দালানের বিভিন্ন অংশ দেখা দিয়েছে ফাটল।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্টেশনের পশ্চিমাংশে পাহাড়ের পাদদেশে বিশাল আয়তনের জায়গা দখল করে ৬০ থেকে ৭০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি সেমিপাকা স্থাপনা, পাশে আরও ৪টি স্থাপনা নির্মাণ কাজ করেছে। মাঝখানে পথ রেখে দুই পাশে ১৮টি বড় কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে। আছে বিদ্যুৎ সংযোগও। পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি নেওয়া হচ্ছে ভেতরে। সেখানে মই নিয়ে লোহার গ্রিল ওয়ারিংয়ের কাজ করছেন কয়েকজন শ্রমিক।

এসময় কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা জাহেদুল হাসানের সাথে। তিনি বলেন, ‘স্থাপনাটি নির্মাণ করছেন পেকুয়ার সন্তান, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা লায়ন মুজিবুর রহমান। গত রমজানের ঈদের পর থেকে এ স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। শ্রমিকরা দিনরাত এখানে কাজ করছেন। নির্মাণ কাজের শুরুর দিকে কয়েকবার পুলিশ এসে ঝামেলা করেছে। তখন শ্রমিকরা পালিয়ে যেত। মালিকের প্রভাব থাকায় পরে আর ঝামেলা হয়নি। এখন নির্বিঘেœই কাজ চলছে। মালিক পক্ষের লোকজন বলে ইউনিভার্সিটির জন্য এ স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন হবে এ স্থাপনা। ইতিমধ্যে সেখানে ২৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৪ ফুট প্রস্তের ১৮টি কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব কক্ষের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে আরও কাজ চলবে বলেও জানান তিনি’।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এ টিএনটি পাহাড়ের পাদদেশের বিশাল আয়তনের জায়গার মালিকানা দাবী করেন লায়ন মুজিবুর রহমান। পুরো জায়গার দখল ঠিক রাখতে তিনি ছোট ছোট ঘর নির্মাণ করে ২০টি পরিবারকে থাকতে দিয়েছেন। পুরো জায়গা ও স্থাপনা নির্মাণ কাজের দেখভাল করেন আরিফ নামে একজন। যোগযোগ করা হলে আরিফ বলেন, ‘ক্রয়সূত্রে ওই জায়গায় মালিক লায়ন মুজিবুর রহমান। সেখানে ইউনিভার্সিটির আলাদা ডিপার্টমেন্ট হবে।’

সেখানে ছোট একটি কুড়ে ঘরে বসবাস করেন আবদুল করিম ও তার পরিবার। আবদুল করিম বলেন, ‘শুনেছি এখানে ইউনিভার্সিটি হবে। গত ঈদের পর থেকে নির্মাণ কাজ চলছে। প্রতিদিন কাজ চলে। আমরা এখানে থেকে জায়গার দেখাশোনা করি। আগামী দুয়েকদিনের মধ্যে বিশ^বিদ্যালয়ের ক্লাশ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।’

এ স্থাপনাটির নির্মাণ কাজ বন্ধ করা ও উচ্ছেদ করার জন্য সম্প্রতি জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার ও কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন কক্সবাজার টেলিকম উপ-বিভাগের সরকারি ব্যবস্থাপক (টেলিকম) মুঃ কাউসার হামিদ মিজি। এর প্রেক্ষিতে কক্সবাজার সদর থানার একদল পুলিশ গিয়ে একবার নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু, এরপর থেকে প্রতিদিন রাতের অন্ধকারে শত শত শ্রমিক দিয়ে পুনরায় স্থাপনা নির্মাণ কাজ চলছে পুরোদমে।
জানা গেছে, একই স্থানে পাহাড় কাটার অভিযোগে গত ২০১১ সালে ২৭ জনকে আটক করে পুলিশ। এ ঘনটায় তৎকালীন এসআই মুজাহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে মুজিবুর রহমানসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর থানায় পরিবেশ সংক্রান্ত আইনে মামলা দায়ের করেন।

এসব বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে লায়ন মুজিবুর রহমান বলেন, ‘যেখানে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, সেই জায়গাটি আমার ক্রয় করা এবং জোত জমি। এখানে কোন পাহাড় কাটা হয়নি।’

শুধু মুজিবুর রহমান নন, মাইক্রোওয়েভ স্টেশন টাওয়ারের নিচে ইতোপূর্বে পাহাড় দখল করেছেন ইলিয়াছ সওদাগর, রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, মাহমুদুল হক, ইয়াবা ব্যবসায়ী হাজি সাইফুল করিম (সম্প্রতি বন্দুকযুদ্ধে নিহত) সহ অনেক প্রভাবশালী। ইতোপূর্বে সেখানে শতাধিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। পাহাড়ের চারপাশ ঘিরে রয়েছে অবৈধ দখলদারদের বসতি। ইতোপূর্বে বিশাল আয়তনের পাহাড় কাটার দায়ে ইলিয়াছ সওদাগরকে ৯ লাখ টাকা জরিমানাও করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমান আদালত কয়েক দফা সেখানে অভিযান চালিয়ে ঘরবাড়িও উচ্ছেদ করেছে। তবুও তার দখলযজ্ঞ থামেনি। পাহাড়ের বিশাল আয়তনের জমি রয়েছে তার দখলে। সেখানে তিনি স্থাপনা নির্মাণ করে লোকজনকে থাকতে দিয়েছেন। কিছু জায়গা বিক্রিও করেছেন। প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে হাত করে তিনি দখল প্রক্রিয়া বজায় রেখেছেন। ওই এলাকায় ব্যাপক আধিপত্য রয়েছে ইলিয়াছ সওদাগরের। তবে এ বিষয়ে কথা বলতে নানাভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও অভিযুক্ত ইলিয়াছ সওদাগরের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

টিএন্ডটি পাহাড় হিসেবে পরিচিত ঝিলংজা মৌজার সংরক্ষিত বনভূমির আরএস ৮০০১ দাগের পাহাড় দখল করা ১২৭ জনের একটি তালিকা করেছে কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগ। ২০১৫ সালে করা ওই তালিকা এখনও হালনাগাদ করা হয়নি। কক্সবাজার সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো: তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘খুব শিগগিরই তালিকাটি হালনাগাদ করা হবে। ২০১৫ সালের পরে আরও অনেকেই বনভূমি দখল করেছেন। জনবল সংকটের কারনে আমাদের একার পক্ষে পুরো বনভূমি রক্ষা করা খুব কঠিন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট্য সকলের আন্তরিক সহযোগীতা প্রয়োজন।’

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের সহকারি বন সংরক্ষক মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, ‘টিএন্ডটি পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনা নির্মানের বিষয়ে সম্প্রতি বাংলাদেম পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) একটি নোটিশ আমরা পেয়েছি। এ বিষয়ে করনীয় নির্ধারণ করতে ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথেও কথা হয়েছে। আজও হয়তো বিষয়টি নিয়ে আলাপ হবে। আমরা এ বিষয়ে খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেবো।’

সম্প্রতি সেখানে অভিযান চালান কক্সবাজার সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরিয়ার মোক্তারের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এরপর সেখানে স্থাপনা নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। এ সময় তিন শ্রমিককে আটক করা হয়। পাহাড় কাটার কিছু সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। অভিযুক্ত মুজিবুর রহমানকে এক লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরিয়ার মোক্তার সাংবাদিকদের বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা মাইক্রোওয়েভ স্টেশনের পাদদেশে পাহাড় কাটা ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সত্যতা পাওয়া গেছে। এজন্য তাৎক্ষণিক নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অভিযানে অংশ নেয়া পরিবেশ অধিদফতরের কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক নুরুল আমিন বলেন, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও রেহাই পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেয়াও সম্ভব হয় না। এসব সংঘবদ্ধ চক্র নানা ভুয়া দলিলপত্র নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করে।
এদিকে গত রোববার অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় টিএন্ড পাহাড়ের সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের প্রস্তাব উত্থাপন করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা। এসসময় কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবু তাহের ও মুক্তিযোদ্ধা মো: শাহজাহান বিষয়টির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য রাখেন।

এর প্রেক্ষিতে ওই সময়ে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকের দায়িত্বপালন করছিলেন মো: আশরাফুল আশরাফ। তিনি বলেছিলেন, ‘টিএন্ডটি পাহাড় কেটে অবৈধ স্থাপনা নির্মানের যে অভিযোগ উঠেছে তা তদন্ত করে উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু, এই পর্যন্ত কোন ধরণের বড় কিছু করা সম্ভব হয়নি।

বেলার আইনী নোটিশ :

ঝিলংজা মৌজার সংরক্ষিত বনভূমির আরএস ৮০০১ দাগের পাহাড় কর্তন, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ ও নির্মিত সকল স্থাপনা উচ্ছেদের দাবীতে ভূমি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গনপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, কউক চেয়ারম্যান, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ ১৫ জনকে আইনী নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। গত ৮ জুলাই রেজিস্ট্রি ডাকযোগে পাঠানো এ নোটিশে পাহাড় ও বনভূমি ধ্বংসের সাথে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী জানানো হয়।

আবরারের মৃত্যু আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়ে গেল – ইশতিয়াক আহমেদ
দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2019

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!