এইমাত্র পাওয়া

x

৮টি ডাম্পার দিয়ে ফেলা হচ্ছে শহরের বর্জ্য

বাঁকখালী নদী যেন ডাম্পিং স্টেশন

বৃহস্পতিবার, ০৮ আগস্ট ২০১৯ | ৭:৫৩ অপরাহ্ণ | 399 বার

বাঁকখালী নদী যেন ডাম্পিং স্টেশন

কক্সবাজারের বাঁকখালী নদী ভরাট করে প্রতিদিন ৮টি ডাম্পার দিয়ে বর্জ্য ফেলছে কক্সবাজার পৌরসভা। এ নদী এখন নাব্যতা হারিয়ে কক্সবাজার পৌরসভার ডাম্পিং স্টেশনে পরিণত হয়েছে। দৈনিক টন টন বর্জ্য নিক্ষেপের ফলে অব্যাহত রয়েছে কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী নদী ‘বাঁকখালী’ ভরাটে। ভরাট অব্যাহত থাকায় বাঁকখালী নদী পাড় দখল করে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা।
এদিকে জমি জটিলতায় ঝুলে রয়েছে ডাম্পিং স্টেশন (বর্জ্য ফেলার স্থান) নির্মাণ কাজ। যদিও কক্সবাজার পৌরসভার কর্তকর্তারা জানান, ডাম্পিং স্টেশনের জন্য নতুন জায়গা নেয়া হয়েছে। কয়েক বছর আগে ডাম্পিং স্টেশনের নির্ধারিত জায়গাটি বিভিন্ন কারণে স্থগিত হয়ে যায়। গত শুক্রবার কক্সবাজার পৌরসভা কক্সবাজার পৌরসভা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি পরিশোধনের জন্য ঝিলংজা মৌজায় নতুন করে ২ একর জমি নির্ধারণ করে। কিন্তু এরমধ্যেও থেমে নেই বাকঁখালী নদীতে বর্জ্য ফেলা।

কক্সবাজার পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, শহরের উত্তর নুনিয়ারছড়া এলাকায় সর্বপ্রথম ডাম্পিং স্টেশনের জন্য জমি নির্ধারণ করা হয়ে ছিলো। এরপর নির্ধারণ করা হয় রামু উপজেলার চেইন্দা মৌজায়। পরবর্তীতে আবারও জমি নির্ধারণ করা হয় একই উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি এলাকায়। সর্বশেষ ডাম্পিং স্টেশনের জন্য জমি নির্ধারণ করা হয়েছে ঝিলংজা মৌজায়।

সূত্রে জানা যায়, এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট আপত্তির কারণে শহরের উত্তর নুনিয়ারছড়া এলাকায় ডাম্পিং স্টেশনের জন্য নির্ধারিত জমি বাতিল হয়ে যায়। এদিকে রেললাইন প্রকল্পের জন্য জমি বরাদ্দ দেয়া হলে বাতিল হয়ে যায় চেইন্দায় নির্ধারিত ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ কাজ। অন্যদিকে বিভিন্ন অভিযোগে স্থগিত হয়ে যায় দক্ষিণ মিঠাছড়িতে নির্ধারিত স্থান। সর্বশেষ কক্সবাজার পৌরসভা ডাম্পিং স্টেশন (বর্জ্য ফেলার স্থান) নির্মাণ কাজের জন্য ঝিলংজা মৌজায় নতুন করে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, শহরের টেকপাড়া, নুর পাড়া, হাঙ্গরপাড়া, পেশকার পাড়া, কস্তুরাঘাট এলাকা, নতুন বাহারছড়া এলাকা, ৬নং জেটিঘাট সহ শহরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বর্তমানে পৌরসভার বর্জ্য ফেলার অন্যতম স্থানে পরিণত হয়েছে। এসব জায়গায় নিয়মিত বর্জ্য ফেলা হয়। একের পর এক বাতিল হয়ে যাচ্ছে পৌরসভার বর্জ্য ফেলার ডাম্পিং স্টেশনের নির্মাণ কাজ। এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে স্বার্থন্বেষী সুবিধাবাদীরা। তারা এসব বর্জ্যের উপর পুনরায় মাটি ভরাট করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করছে। এতে প্রতিনিয়ত ভরাট হয়ে যাচ্ছে বাঁকখালী নদী। গত কয়েক বছর আগে জেলা প্রশাসন ও কক্সবাজার পৌরসভার সমন্বয়ে এসব অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে ১৩৯ জনের তালিকা তৈরি করে। শুধু তালিকা তৈরিতেই সীমাবদ্ধ থাকেন দখলদারেরা। এখন এসব অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসনকে। সব মিলিয়ে বাঁকখালী নদী বর্তমানে অস্থায়ী ডাম্পিং স্টেশনে পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বাঁকখালী বর্জ্য ফেলার উপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে রীট করেন। ৮৩২৫/২০১৪ ইং রীট পিটিশন শুনানী শেষে বাঁকখালীতে বর্জ্য না ফেলতে নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত। বাঁকখালী নদীর সাথে লাগোয়া শহরের কয়েকটি পয়েন্ট সরেজমিন পরিদর্শন করলে সহজে বুঝা যায় আদালতের নিষেধাজ্ঞা মানা হচ্ছে কিনা। এমন অবস্থা বাঁকখালী নদী কক্সবাজারের মানচিত্র থেকে তুলে ফেলতে বেশিদিন সময় লাগবে না বলে জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সচেতন মহল। সচেতন মহলের দাবি, বাঁকখালী নদীর এরূপ অবস্থা ভবিষ্যতে কক্সবাজারের সুষ্ঠু পরিবেশকে বিপন্ন করে তুলবে।

অনেকে ক্ষোভ নিয়ে জানান, সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানা গেছে বাঁকখালীর নদীল নাব্যতা আগের মতো ফিরিয়ে আনতে ২০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাঁকখালী নদী কিছুটা হলেও আগের স্থানে ফিরে আসবে। এখন থেকেই অন্ততঃ বাঁকখালী নদী নতুন করে ভরাট করা থেকে বিরত থাকা দরকার। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে এখনো থেমে নেই বাঁকখালীতে বজ্য ফেলে ভরাট করা। ভরাট করা হচ্ছে তা চোখে পড়ার মতো। এসব ভরাট প্রকল্প বন্ধ করা না গেলে সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বাধাগ্রস্থ হবে। অন্যদিকে জেলার কক্সবাজার শহর সহ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের বসবাসকারীরা দূর্ভোগের শিকার হবে।

৬নং জেটিঘাট এলাকার নৌকার মাঝি খোরশেদ জানান, ‘শহরের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বাঁকখালী নদী বলতে গেলে অস্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন। প্রতিদিন ট্রাকে ট্রাকে বর্জ্য ফেলা হয় বাঁকখালীতে। ৬নং জেটিঘাট এলাকায় কয়েকদিন আগেও বর্জ্য ফেলা হয়েছিল। এসব বর্জ্যরে স্থান বাঁকখালী নদীর পাড় এখন প্রভাবশালীদের দখলে। তৈরি করা হয়েছে শান্তির নীড়। এভাবে প্রতিদিন বর্জ্যফেলা স্থান দখলে পরিণত হচ্ছে। আর ভরাট হচ্ছে বাঁকখালী।’

কস্তুরাঘাট এলাকার মিনহাজ চৌধুরী নামের এক ব্যবসায়ী জানান, ‘বদর মোকামস্থ রাস্তার পাশেই কস্তুরাঘাট ছিল। অথচ এখন তা শুধু স্মৃতি। বর্জ্যে ভরাট হতে হতে কস্তুরাঘাট এলাকায় গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি স্থাপনা। এখনো নিয়মিত বর্জ্য ফেলা হচ্ছে কস্তুরাঘাট এলাকায়।’

এন্ডারসন রোডস্থ সরওয়ার জানান, ‘বাঁকখালী নদী এক সময় কক্সবাজার শহরের অধীনে ছিল। তার ওপারে ছিল খুরুশকুল, পিএমখালী সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন। কিন্তু বর্তমানে বাঁকখালী নদীর চিত্র তার ব্যতিক্রম। কক্সবাজার শহরের বর্জ্য নিক্ষেপের কারণে তা প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। বাঁকখালী অবস্থান করছে খুরুশকুল-পিএমখালী সহ সংশ্লিষ্ট এলাকায়। এসব সংশ্লিষ্ট এলাকার জমি ঢুকে পড়েছে কক্সবাজার শহরে। তা থেকে সহজে অনুমেয় হয় বর্জ্যরে কারণে বাঁকখালী কতটা ভরাট হয়েছে। এখনো ভরাট হচ্ছে নিয়মিত।’
বাঁকখালী নদীতে বর্জ্য ফেলার বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিদর্শক করিব হোসেন বলেন, ‘বাঁকখালী নদীর পাড়ে বর্জ্য ফেলার বিষয়ে আমি অবগত নেই। যদি কোন ডাম্পারের ড্রাইভার বর্জ্য ফেলে তাহলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর আমার পায়ে ব্যথা থাকায় কাজে যেতে না পারায় তদারকীর জন্য আরেকজনে দায়িত্ব দিয়েছি। তার অগোচরে হইতো বাঁকখালীতে বর্জ্য ফেলছে।’

শহরের বাঁকখালী নদী ভরাটের উদ্বিগ্ন মহলের ক্ষোভ, বাঁকখালী নদীর পাড়ে বর্জ্য ফেলা ও অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় পুঁতিগতভাবে সীমাবদ্ধ। শহরের বর্জ্যে বাঁকখালী ভরাটের বিষয়টি সকলের নজরে রয়েছে। অথচ কারও কিছু করারনেই এমন অবস্থা। বাঁকখালী নদীতে বর্জ্য ফেলা ও ভরাট হওয়া জায়গা অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের পাশাপাশি নতুন করে বাঁকখালী ভরাট না হওয়ার জন্য সচেতন হওয়া জরুরি। তা না হলে ‘বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ, বাঁচায় প্রকৃতি বাঁচায় দেশ’ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপাদ্য বিষয় কখনো সফল হবে না।

গত শুক্রবার ২ আগস্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি পরিশোধন এ দু’টি প্রকল্প হাতে নিয়েছে কক্সবাজার পৌরসভা। এ জন্য সদরের ঝিলংজা মৌজায় প্রস্তাবিত ২ একর জায়গা এবং ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণের জন্য পিএমখালী ইউনিয়নের বাকঁখালী নদী সংলগ্ন অংশে ৯ একর জায়গা নির্ধারণ করে ভূমি অধিগ্রহন করা হচ্ছে।

বাঁকখালী নদীতে কোন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে না দাবি করে কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মুজিবুর রহমান বলেন, ‘ ইতোমধ্যে বর্জ্য থেকে আমরা জৈব সার উৎপাদন করছি। প্রান্তিক কৃষকরাও এর সুফল ভোগ করছে। এবার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (ওয়েষ্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) এর মাধ্যমে জৈব সারসহ পুণ:ব্যবহারযোগ্য আরো বিভিন্ন কিছু উৎপাদন করা হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎও উৎপাদন করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।’

এছাড়া পানি পরিশোধন ব্যবস্থাপনা (ওয়াটার ট্রিটম্যান্ট প্ল্যান্ট) করে এটিতে বাঁকখালী নদীর পানি পরিশোধন পূর্বক পানযোগ্য ও ব্যবহার উপযোগী করে সমগ্র পৌর এলাকায় সরবরাহ করা হবে। বিশেষ করে কক্সবাজার পৌরসভার নাগরিকদের সুবিধাবৃদ্ধি ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে এ দু’টি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মেয়র মুজিবুর রহমান।

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2019

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!