বহুল আলোচিত জালিয়াত চক্রের প্রধান বেলাল গ্রেপ্তার

সোমবার, ২০ মে ২০১৯ | ৭:৫১ অপরাহ্ণ | 411 বার

বহুল আলোচিত জালিয়াত চক্রের প্রধান বেলাল গ্রেপ্তার

কক্সবাজার আদালতে মামলায় হাজিরা দিতে আসা মামলার আসামীকে অপহরণের সময় বেলাল আল আজাদ (৩০) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার (২০ মে) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। সকালে সৈয়দ মোহাম্মদ আবুল আলা নামের মামলার এক আসামীকে অপহরণের চেষ্টা চালায়। এসময় উপস্থিত জনতা বেলাল আল আজাদকে গণধোলাই দেয় এবং পুলিশ গিয়ে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ গ্রেপ্তারের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

অপহরণর সময় বেঁচে যাওয়া সৈয়দ মোহাম্মদ আবুল আলা অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি সকালে মামলায় বেলাল আল আজাদের দেয়া একটি মামলায় আদালতে হাজির দিতে আসি। মামলায় হাজিরা দিয়ে বেরিয়ে আসার এসময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে আমাকে বেলাল আজাদ সহ ১০ থেকে ১২জন যুবক আমারকে তুলে নেয়ার চেষ্টা করে। এসময় আমার আত্মচিৎকারে উপস্থিত লোকজন আমাকে উদ্ধার করে এবং ঘটনাস্থরে কক্সবাজার সদর থানার পুলিশ অপহরণের মুলহোতা বেলাল আজাদকে গ্রেপ্তার করেন।

ঘটনাস্থলে অভিযানের নেতৃত্ব দেয়া কক্সবাজার সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক দেবব্রত রায় বলেন, ‘আমি আমার কাজ শেষে থানায় ফিরে আসার সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে দেখি যে কিছু লোক এক যুবককে মারধর করছে এবং টানাহেচড়া করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এসময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জানতে পারি যে মামলা বিরোধের জের ধরে সৈয়দ আবুল আলা নামের এক যুবককে অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। এসময় আমি বেলাল আজাদ নামের এক লোককে গ্রেপ্তার করি। এসময় অন্যান্যরা পালিয়ে যায়’।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি খন্দকার ফরিদ উদ্দিন সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ‘বেলাল আল আজাদ নামের একজনকে আটক করেছে পুলিশ। পরে পুলিশ জানতে পেরেছেন যে আটক বেলাল আজাদের নামে মাদক আইন, জাতিয়াত ও বিভিন্ন অভিযোগে ৪ থেকে ৫টি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

উল্লেখ্য, বেলাল আহমদ ওরফে বেলাল আল আজাদ নিজেকে আইনজীবী সহকারি পরিচয়ে আদালতপাড়া প্রতিদিন সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে আসছে। বিভিন্ন জটিল মামলায় আসামীকে জামিনে মুক্ত করার কথা বলে সাধারণ মানুষ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় কৌশলে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে কক্সবাজার আদালতের সিনিয়র আইনজীবীদের স্বাক্ষরজাল, ডেপুটি জেলারের স্বাক্ষরজাল সহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি মামলা সহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। আইনজীবী সহকারি সমিতি থেকে নিবন্ধন বাতিল হওয়া বেলাল আজাদ এখনও নিজেকে কখনও আইনজীবী, কখনও সাংবাদিক, আবার কখনও বিচারকের ঘনিষ্টজন পরিচয় দেয় আদালতপাড়ায় চষে বেড়ায় প্রতিদিন। এতে আইনজীবী, আইনজীবী সহকারিদের যেমন সম্মান হানি হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হয়ে মামলা ভোগান্তিতে পড়ছে।

অভিযোগ রয়েছে, রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজার জেলায় সব ধরণের জন্মনিবন্ধন বন্ধ থাকলেও বেলাল আহমদ প্রকাশ বেলাল আজাদ ওরফে টাউট বেলাল নিমিষেই এসব জন্মনিবন্ধন ফরম তৈরী করে দিচ্ছে। সম্পূর্ণ জাতিয়াতির মাধ্যমে ভূঁয়া এসব জন্মনিবন্ধন তৈরী করে ভূক্তভোগীদের ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। মামলায় প্রয়োজন আছে বলে নানা অজুহাত দেখিয়ে বাধ্য হয়ে এসব জন্মনিবন্ধন ফরম তৈরী করে দিচ্ছে। সম্প্রতি, উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর জাল করা একটি জন্মনিবন্ধ ধরা পড়ে যাওয়ায় জালিয়াতচক্রের প্রধান বেলালের জালিয়াতি ফাঁস হয়ে যায়। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে বাটপার বেলাল গা ঢাকা দেয়।

জানা গেছে, উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের সোনাইছড়ি গ্রামের মৃত বদিউর রহমানের ছেলে বেলাল আহমদ ওরফে বেলাল আল আজাদ। পিতা মাতার ইচ্ছে ছিল ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে মানুষের মত মানুষ গড়বে বেলালকে। এ কারণে তাকে প্রথমে উখিয়ার রুমখাঁপালং দাখিল মাদ্রাসা ও পরে সোনারপাড়া দাখিল মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেয়। কিন্তু, পড়ালেখায় বেশী দূর যেতে পারেনি বেলাল। পিতা হারা অভাব অনটনের সংসারে দিনে দিনে পা বাড়ায় অপরাধ জগতে। কোন উপায়ন্তর না দেখে কক্সবাজার আইনজীবি সহকারি সমিতি থেকে বাগিয়ে নেয় নিবন্ধন। অবশ্য, পরে তার নিবন্ধ আইনজীবী সহকারি সমিতি থেকে বাতিল হয়ে যায়। এরপরও আইনজীবী সহকারির পদটি ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত অবৈধভাবে প্রতারণা ও জালিয়াতি করে যাচ্ছে আদালত পাড়ায়।

আদালত পাড়ার একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলা পশ্চিম ফোমরা এলাকার মৃত আব্দুল জলিলের ছেলে রজি উল্লাহ নামের এক ইয়াবা কারবারিকে গত ২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর উখিয়া থানার পুলিশ বিপুল পরিমাণ ইয়াবা সহ আটক করে আদালতের মাধ্যমে জেলা হাজতে প্রেরণ করেন। যার মামলা নং উখিয়া থানা-১৯, জিআর-৩৯৪/১৭ এবং এসটি-৯৭৪/১৮। উক্ত মামলায় আইনজীবী সহকারি হিসাবে বেলাল আল আজাদ মৌখিকভাবে চুক্তি করেন যে আসামী রজি উল্লাহকে জেল থেকে বের করার। এতে মামলায় আইনজীবী হিসাবে এডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুকে নিয়োগ করা হয়। উক্ত মামলার একাধিক শুনানি শেষে এক পর্যায়ে হাইকোর্ট থেকে জামিন লাভ করে ইয়াবা কারবারি রজি উল্লাহ। উক্ত জামিন নামা নথিপত্র সহ জেলা কারাগারের ডেপুটি জেলারের স্বাক্ষর জাল করে একটি অঙ্গীকার নামা নি¤œ আদালতে প্রেরণ করার পর রজি উল্লাহ জামিন বহাল রেখে জেলা জজ আদালত গত ১৪ এপ্রিল জামিনের ফাইলটি কক্সবাজার জেলা কারাগারের প্রেরণ করেন এবং আসামীকে মুক্তি আদেশ দেন। কিন্তু, উক্ত মামলার হাইকোর্টের ছায়াকপি, অঙ্গিকারনামার ছায়াকপি ও নথিপত্র গুলোর সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে কারাগারের ডেপুটি জেলারের নকল করা স্বাক্ষরটি ধরাপড়ে জেল সুপারের হাতে। এতে কারাকর্তৃপক্ষ আসামী ছেড়ে না দিয়ে বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে উক্ত মামলার আইনজীবী নুরুল ইসলাম নুরুকে গত ৮ এপ্রিল ৪৪৮ নং স্বারকমুলে ১০দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেন। পরে উক্ত নোটিশের জবাব দেন এডভোকেট নুরুল ইসলাম। জবাবে বলা হয়েছে তার আইনজীবী সহকারি বেলাল আজাদ জাল ও জালিয়াতি মাধ্যমে ডেপুটি জেলারের স্বাক্ষর ও সীল সৃজন করেন। এতে সরল বিশ^াসে সে স্বাক্ষর করেন। একইভাবে ৯ এপ্রিল এডভোকেট ক্লার্ক সমিতি থেকে তার নিবন্ধন বাতিলের জন্য আবেদন করা হয়।

প্রতারক ও জালিয়াতি চক্রের প্রধান বেলাল আহমদ ওরফে বেলাল আজাদ আইনজীবী সহকারি ছাড়াও বিভিন্ন অনলাইন, স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয়ে নানা কৌশলে সাধারণ মানুষের কাজ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসে গিয়ে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কৌশলে নানা সুবিধা আদায় করে যাচ্ছে। অপরাধ জগত থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা আয় করার সুবাধে এই পর্যন্ত বিয়ে করেছেন তিনটি। কিন্তু, এতকিছুর পরও রহস্যজনক কারণে আদালতপাড়া সহ পুরো জেলায় বিচরণ করছে। বেলালের এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করছে না। এমনটি দাবি ভূক্তভোগীদের।

দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে কক্সবাজার আদালতপাড়ার জালিয়াত চক্রের প্রধান বেলাল ওরফে মুন্সী বেলাইল্যার হাতে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছে মামলার বাদি-বিবাদীসহ সাধারণ মানুষ। নিজেকে আইনজীবী সহকারি পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আইনজীবীদের স্বাক্ষর জাল, বিচারকের স্বাক্ষর জাল, কোন তদন্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষর থেকে শুরু করে জেল সুপার ও ডেপুটি জেলাদের স্বাক্ষর সম্পূর্ণ জাতিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এতে করে একদিন সাধারণ মানুষ হয়রানি হচ্ছে, অন্যদিকে কক্সবাজার আদালতে বিচারকার্য সম্পন্ন করতে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। আর এসব কিছুর বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়। এসব কিছু ধীরে ধীরে যখন বেলাইল্যার অপকর্ম ফাঁস হয়ে যাচ্ছে, তখন আদালত প্রাঙ্গণ থেকে এখন গা ডাকা দিয়েছে। গত সপ্তাহে কক্সবাজারের স্থানীয় পত্রিকা, অনলাইন সহ বিভিন্ন গনমাধ্যমে বেলাইল্যার অপকর্ম নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হলে আদালতপাড়া তোলপাড় সৃষ্টি হয়। অনেকে ওই বেলাইল্যাকে খুঁজতে মাঠে নেমেছে। অনেকে আবার আইন শৃংখলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ দিয়েছেন।

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2020

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!