বর্ষা উৎসব : সৈকতে রাখাইনদের মুগ্ধকর আয়োজন

শনিবার, ০৬ জুলাই ২০১৯ | ৮:২৫ অপরাহ্ণ | 262 বার

বর্ষা উৎসব : সৈকতে রাখাইনদের মুগ্ধকর আয়োজন

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের ঝাউবাগানে রাখাইন তরুণ-তরুণী আর আবাল-বৃদ্ধ বনিতাদের দলবেঁধে ঘুরে বেড়ানো, জড়ো হয়ে আড্ডা দেয়া, নাচ-গান এবং দৌঁড়ঝাপে যেন সৃষ্টি হয়েছিল ভিন্ন এক পরিবেশ ও আবহ। সেই সাথে রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী নানা রকমের খাবার ও কোমল পানীয় পানের দৃশ্য কক্সবাজারের ক্ষুদ্র এ নৃ-গোষ্ঠির ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি উপস্থাপনের আয়োজনেরই যেন ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়ায়।

শুক্রবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের শৈবাল পয়েন্ট এবং কবিতা চত্বর পয়েন্ট এলাকা জুড়ে রাখাইনদের ‘বর্ষা উৎসবের’ তৃতীয় দিনে এ ধরণের মনোমুগ্ধকর আয়োজন।
উৎসবে অংশগ্রহণকারি রাখাইনরা জানিয়েছেন, গত ২১ জুন থেকে শুরু হয়েছে রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী ‘বর্ষা উৎসব’। শুক্রবার ছিল তৃতীয়বারের মত আয়োজন। আগামী ১৯ জুলাই শেষ হবে ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজনের।
এটি কোন ধর্মীয় উৎসব নয়; মূলত: সামাজিক উৎসবই। প্রতিবছর বর্ষা ঋতুর আষাঢ় মাসের প্রথম শুক্রবার থেকেই এ উৎসবের শুরু হয়। সমাপ্তি ঘটে বৌদ্ধদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব আষাঢ়ী পূর্ণিমা দিনের আগের শুক্রবারে। আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতেই শুরু হয় বৌদ্ধদের ৩ মাসব্যাপী ‘বর্ষাবাস ব্রত’ পালন।

রাখাইন তরুণ মংলামে জানান, বর্ষা উৎসবটি কোন ধরণের ধর্মীয় নয়; সামাজিক উৎসব। ধর্মীয় সাধনার মাস শুরুর আগে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীরা মিলে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এ উৎসবের আয়োজন করে থাকে। মূলত: বর্ষার প্রথমদিককার বৃষ্টি আর সাগর জলে স্নাত হয়ে আনন্দ-আহ্লাদে কাটানোই এ উৎসবের মূল লক্ষ্য। এতে সকলে দ্বিধা-দ্বন্ধ, সংঘাত ও হানাহানি ভুলে সবাই মিলে সারাদিন আনন্দে মেতে থাকতে রাখাইনরা এ উৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকেন।
রাখাইন কমিউনিটির নারী নেত্রী মাটিন টিন রাখাইন বলেন, অন্তত গত অর্ধ-শতাব্দীকাল কাল ধরে রাখাইন সম্প্রদায় এ উৎসব পালন করে আসছে। একটা সময় হিমছড়ির সৈকত ঘেঁষে পাহাড়ের পাদদেশে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণতায় এ উৎসব পালন হত। কালের প্রবাহের আয়োজনের ক্ষেত্রে কিছুটা ভাটা পড়লেও প্রতিবছর ঐতিহ্যপূর্ণ এ উৎসব পালন হয়ে থাকে।

তিনি আরো বলেন, রাখাইন তরুণ-তরুণী আর আবাল-বৃদ্ধ বনিতারা নানা রকমের খাবার-দাবারসহ বর্ষা মৌসুমের প্রথম শুক্রবার থেকে সৈকতের বাগানে চলে আসেন। এরপর দলবেঁধে নাচগানের পাশাপাশি হই-হুল্লোড়ে মেতে উঠেন। এসময় সৈকত ছাড়াও পুরো ঝাউবাগান জুড়ে যেন সৃষ্টি হয় মনরাঙ্গানো এক অনন্য পরিবেশের।

উৎসবে অংশ নিতে এসে কেমন লাগছে- এমনটি প্রশ্নের উত্তরে মংক্যচিং রাখাইন (২৮) বলেন, মূলত: সবাই মিলে বর্ষার প্রথমদিককার বৃষ্টি আর সাগর জলে ¯œাত হয়ে নিজেদের মন থেকে হিংসা-বিদ্বেষ ও ভেদাভেদ ঘুচিয়ে দিতে এ উৎসবে নিজেকে সামিল করেছেন।
উৎসবের দিন বেশী করে বৃষ্টি হলে আনন্দের মাত্রাও বেড়ে যায় বলে জানান এ রাখাইন যুবক।
দীর্ঘদিন ধরে পড়াশোনার জন্য দেশেরে বাইরে ছিলেন আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত ড. আছিং রাখাইন।

ড. আছিং বলেন, বিদেশে পড়াশোনা করতে যাওয়ার আগে উৎসবের আয়োজনের সঙ্গে এখনকার আয়োজনের অনেক কিছুই বদলেছে। এখন অনেকটাই বেশী জাঁকজমকপূর্ণতায় উৎসবের আয়োজন হচ্ছে। উৎসবে এসে পুরনো অনেক বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। এটি আমাকে চরমভাবে মুগদ্ধ করেছে। উৎসবে অংশগ্রহণে সবার মধ্যে প্রাণের স্পন্ধন দেখতে পেয়েছি।
রাখাইনদের সামাজিক এ উৎসবটিকে আরো বর্ণিল করে তুলতে সরকারি ও প্রশাসনিক সহযোগিতার প্রয়োজন বলে মন্তব্য করে ড. আছিং।

উৎসবে রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী খাবার-দাবার, কোমল পানীয় পান, নাচগান, দলবেঁধে আড্ডা দেয়া, হই-হুল্লোড় এবং দৌঁড়ঝাঁপের রূপ যেন বর্ষাকালীন পিকনিক বা আনন্দায়োজনও বলা চলে। মূলত: এ উৎসবের মধ্য দিয়ে বর্ষাকে বরণ করার আয়োজনই করা হয়।
শুরুতে শুধুমাত্র কক্সবাজার শহরের রাখাইনরা অংশগ্রহণ করে থাকলেও এখন সেটির গন্ডি অনেকখানি পেরিয়েছে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের ঝাউবাগানে আয়োজিত এ উৎসবে অংশ নিতে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িসহ আরো কয়েকটি এলাকার রাখাইনসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টির মানুষ এ উৎসবে অংশ নিতে প্রতিবছর যোগ দেন।

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2020

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!