পর্যটনের সুফল পায় না সেন্টমার্টিন দ্বীপবাসী!

শনিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৬:৪২ অপরাহ্ণ | 138 বার

পর্যটনের সুফল পায় না সেন্টমার্টিন দ্বীপবাসী!

সাগর উত্তাল। এ কারণে ছোট ট্রলারে না উঠে বড় ট্রলারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন ৮৮ বছরের বৃদ্ধ কবির আহমদ। চোখে মুখে হতাশা। বাড়ি সেন্টমার্টিন দ্বীপের পশ্চিম পাড়া গ্রামে। বুড়ো বয়সেও ঝুঁকি নিয়ে টেকনাফে যেতে হচ্ছে তাকে। সেখানে একটি আবাসিক হোটেলে তিন হাজার টাকায় নৈশপ্রহরীর কাজ করেন তিনি।
জেটির কাছে চায়ের দোকানে কথা হচ্ছিল কবির আহমদের সঙ্গে। একা বসে আছেন কেন? তার উত্তর,‘জেনে কী করবেন! ১১ বছরের বেশি সময় ধরে দ্বীপ অধিবাসীদের খোঁজ-খবর নেয়নি কেউ। বলে লাভ কী? এখানে দ্বীপবাসীর কথা ভাবে না কেউ। সবাই শুধু পর্যটকদের নিয়ে ব্যস্ত!’

কবির আহমদের ধারণা, প্রতি বছরের মতো অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যটন মৌসুমে সাগর পাড়ি দিয়ে বেড়াতে আসা ভ্রমণপিপাসুদের ভিড়ে ভরে যাবে সেন্টমার্টিন। তারা থাকেন দ্বীপের ১২২টি হোটেল-মোটেল ও কটেজে। কিন্তু দ্বীপবাসী নাকি এর কোনও সুফল পায় না! তার অভিযোগ, ‘অনেক বছর ধরে সেন্টমার্টিনের বাসিন্দাদের জন্য কোনও উন্নয়ন হয়নি। পর্যটন-অর্থনীতির সুবিধায় ঠিকই বড় বড় ভবন গড়ে তোলা হয়েছে দ্বীপে। কিন্তু কোনও হোটেল মালিক স্থানীয় কাউকে চাকরি দেয়নি। তারা নিজেদের লোকজন নিয়ে এসে কাজ করান। এ কারণে স্থানীয়দের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। এক্ষেত্রে দ্বীপবাসী পুরোপুরি সুবিধাবঞ্চিত।’
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে দ্বীপবাসী খুব দুর্দিন কাটাচ্ছেন। পর্যটন মৌসুমে কিছু লোকজন অন্তত ভ্যানগাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো, কিন্তু এখন তা বন্ধ রয়েছে। দ্বীপের অধিকাংশ মানুষের মূল পেশা সাগরে মাছ শিকার। কিন্তু এখন তা করা যাচ্ছে না ঠিকভাবে। এ কারণে দুঃসময় যেন পিছু ছাড়ছে না তাদের।

দ্বীপ অধিবাসীদের সুবিধাবঞ্চিত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর আহমদ। তিনি বলেন, ‘সাগরের বুকে জেগে ওঠা মিয়ানমারের সীমান্তঘেঁষা দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপে ১০ হাজার মানুষের বসতি। কিন্তু রোহিঙ্গারা আসার পর থেকে জেলেদের মাছ শিকার অনেকটা বন্ধের পথে। অথচ এখানে স্থানীয়দের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম মাছ শিকার।’
চেয়ারম্যান নূর আহমদ জানান, প্রায়ই সরকারের পক্ষ থেকে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে। তাছাড়া মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীরা ধরে নিয়ে যাবে এই ভয়ে এখন মাছ শিকারে যেতে চায় না অনেকে। যদিও বিজিবি মোতায়ন হওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে তারা অনেকটা চিন্তামুক্ত।’

সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের মাধ্যমে সরকার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করলেও এখানকার অধিবাসীরা এর সুবিধা তেমন কিছু পায় না বলে মন্তব্য চেয়ারম্যান নূর আহমদের। তাই দ্বীপের মানুষের জন্য আলাদা কর্মসংস্থানের দাবি জানান তিনি।
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত সেন্টমার্টিনের জেটি এখনও সম্পূর্ণরূপে সংস্কার হয়নি। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ইউপি প্যানেল চেয়ারম্যান আবদুর রহমান জানান, দ্বীপে কোনও ব্যাংকের শাখা নেই। এ কারণে অনেকে চাইলেও ঠিকভাবে ব্যবসা করতে পারছেন না। তাই সেন্টমার্টিনে ব্যাংক শাখা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
নুরুল আলম নামে একজন দোকানির অভিযোগ, টেকনাফ থেকে মালামাল আনার ক্ষেত্রে নানান জায়গায় টাকা দিতে হয়। স্পিডবোট থাকলেও শুষ্ক মৌসুম ছাড়া চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। জাহাজে পণ্য আনা-নেওয়া করলেও মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হয়। সেই সঙ্গে রয়েছে ঘাটে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যসহ অতিরিক্ত টোল আদায়। এতে প্রতিটি পণ্যে অনেক খরচ পড়ে যাওয়ায় বেশি দামে বিক্রি করতে হয়, যার প্রভাব পড়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর। আয়-রোজগারের ব্যবস্থা না থাকলেও তাদের ঠিকই বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়।
দ্বীপে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থাকলেও প্রতি ইউনিট ৪২ টাকা নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ। তার মন্তব্য, ‘যেখানে সরকার বিদ্যুৎহীন কোনও ঘর থাকবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে, সেখানে টাকার অভাবে অনেক ঘরে আঁধারে পড়ে আছে।’

এদিকে জোয়ারের পানিতে গত দুই বছরে শতাধিক মানুষের ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। অবশিষ্ট বাড়িঘরের অবস্থাও নাজুক। সেগুলো মেরামত করতে গেলে পরিবেশ অধিদফতর বাধা দেয় বলে অভিযোগ অনেকের।
সেন্টমার্টিন আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন স্পট হলেও তথ্যপ্রযুক্তিতে পিছিয়ে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, সরকার দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করে প্রযুক্তিগত সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু সেন্টমার্টিনের চিত্র ভিন্ন। এখানে তথ্যসেবা কেন্দ্র শুধু কাগজে-কলমে। বাস্তবে কোনও কার্যক্রম নেই।

যোগাযোগ, চিকিৎসা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ মৌলিক অনেক সমস্যা বিদ্যমান সেন্টমার্টিনে। দ্বীপবাসী শিক্ষা থেকে সবচেয়ে বঞ্চিত বলে মনে করেন সেন্টমার্টিন ইউপি প্যানেল চেয়ারম্যান আবদুর রহমান। তিনি জানান, দ্বীপে ১০ হাজার মানুষের জন্য একটি মাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সেখানে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য শুধু একজন শিক্ষক। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে।
দ্বীপে ১১ বছর আগে উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে ১০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করা হয়। কিন্তু এখনও হাসপাতালের জরুরি, গাইনি, সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগে কোনও যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়নি। প্রসূতিসেবা না থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের। তাছাড়া দুই বছর ধরে জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সমস্যার ভুক্তভোগী এখানকার মানুষ।

টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আলম বলেন, ‘সেন্টমার্টিনে অনেক সমস্যা। একদিনে এসবের সমাধান সম্ভব নয়। সরকারের কাছে সমস্যাগুলো তুলে ধরা হবে। বিশেষ করে যোগাযোগ, চিকিৎসা ও শিক্ষার বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2019

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!