নিম্নমানের লিজের প্লেনই ডুবিয়েছে বিমানকে

রবিবার, ১২ মে ২০১৯ | ১২:৫২ অপরাহ্ণ | 152 বার

নিম্নমানের লিজের প্লেনই ডুবিয়েছে বিমানকে

লিজে আনা নিম্নমানের উড়োজাহাজ ভোগাচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে। বছরের পর বছর ধরে বিমানের একটি সিন্ডিকেট এ ধরনের নিম্নমানের উড়োজাহাজ এনে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সের আর্থিক ক্ষতি করেছে।

একই সঙ্গে লিজের উড়োজাহাজ যেমন যাত্রীদের দুর্ভোগ দিয়েছে, তেমনি জীবনও ফেলেছে ঝুঁকির মধ্যে।

লিজে আনা উড়োজাহাজের দুর্নীতি নিয়ে বিমানের ভেতরে বাইরে কথাও হয়েছে বিস্তর। কিন্তু বন্ধ করা যায়নি লিজ বাণিজ্য। সর্বশেষ লিজের উড়োজাহজের ক্ষতির শিকারের উদাহরণ মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে দুর্ঘটনায় পড়া বিমানের ড্যাশ-৮ কিউ ৪০০।

গত ৮ মে উড়োজাহাজটি ইয়াঙ্গুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে গিয়ে রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে। এতে বিমানের পাইলটসহ ৩৫ জন যাত্রীর সবাই কমবেশি আহত হন, হাসপাতালে ভর্তি হন ১৯ জন।

বিমান সূত্রে জানা গেছে, উড়োজাহাজের ফিউজিলাজ ভেঙে তিন টুকরো হয়ে গেছে। উড়োজাহাজটির তলা ফেটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ড্যাশ-৮ মিশরের স্মার্ট এভিয়েশন থেকে পাঁচ বছরের জন্য লিজে আনা হয় ২০১৫ সালে। আগামী বছরের এপ্রিলে এর মেয়াদ শেষ হবে। ড্রাই লিজে আনা (অর্থ্যাৎ এর পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ইন্সুরেন্সের সব ব্যয় বিমানের) উড়োজাহাজটির জন্য ভাড়া হিসেবে বিমানকে প্রতি মাসে ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ডলার পরিশোধ করতে হয়। লিজের চুক্তি অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি যে অবস্থায় আনা হয়েছিল, সেই অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে। এই উড়োজাহাজটি সিচ চেক শেষে গত ৬ মার্চ ভারতের হায়দরাবাদ থেকে ফেরার পথে আকাশেই ইঞ্জিনের ওপরে থাকা ব্ল্যাংকেট পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

বিগত পাঁচ বছরে মিশর থেকে লিজে আনা বোয়িং ৭৭৭ ২০০ ইআর উড়োজাহাজও বিমানকে ভুগিয়েছে মারাত্মকভাবে। এ দু’টি বোয়িংয়ের জন্য রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সকে ৩০০ কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে। বারবার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে মাসের পর মাস এটি গ্রাউন্ডেড হয়ে ছিল। অথচ বিমানকে চুক্তি অনুযায়ী ভাড়া পরিশোধ করতে হয়েছে, আবার যাত্রী পরিবহনও করা যায়নি। বিষয়টি শুধু এখানেই থেমে নেই। অসম চুক্তি করে আনা উড়োজাহাজ দু’টি ফেরত পাঠাতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স পড়েছে নতুন সমস্যায়। চুক্তি অনুযায়ী, উড়োজাহাজ দু’টি যে অবস্থায় আনা হয়েছিল, সেই অবস্থায় ফেরত দিতে হবে।

বিমানের প্রকৌশল শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, বোয়িং দু’টি ইজিপ্ট এয়ার এক বছরেরও বেশি সময় ফেলে রেখেছিল। আমরা যে অবস্থায় উড়োজাহাজ দু’টি পেয়েছিলাম তার থেকে অনেক ভালো অবস্থায় নিয়ে গিয়েছি। অনেক দিন ধরে ফেলে রাখা এই ধরনের উড়োজাহাজ লিজে আনাই ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এই ঘটনার পরেও বিমানের একটি সিন্ডিকেট ইজিপ্ট থেকে আরো দু’টি বোয়িং ৭৭৭ ২০০ ভাড়ায় আনতে চেয়েছিল। তবে সমালোচনার মুখে তা সম্ভব হয়নি।

সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রধান কার্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। বিমানের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোসাদ্দেক আহমেদকেও এক হাত নেন বিমান সচিব মহিবুল হক।

এ সময় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করলেও প্রতিমন্ত্রীর তোপের হাত থেকে রক্ষা পাননি।

এ ঘটনার পর বিমান সচিব লিজে উড়োজাহাজ না আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, লিজে উড়োজাহাজের কারণেই বিমানের জন্য ক্ষতিকারক হয়েছে। তাই ভবিষ্যতে লিজে কোনো উড়োজাহাজ আনা হবে না।

নিয়মিত যাত্রী পরিবহন ছাড়াও হজ ফ্লাইট পরিচালনায় ওই সিন্ডিকেট বছরের পর বছর ধরে কাবো এয়ারলাইন্স থেকে উড়োজাহাজ লিজ নিয়ে এসেছে। ২০ বছরের পুরনো উড়োজাহাজ ভাড়ায় যান্ত্রিক ত্রুটিতে পড়ে তা হজ যাত্রীদের ভুগিয়েছে। এ ঘটনার পর বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ২০ বছরের পুরনো উড়োজাহাজ ভাড়ায় আনতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

এর আগে ডিসি-১০ উড়োজাহাজ লিজে এনেও বেকায়দায় পড়েছিল। এখানেও উড়োজাহাজটিকে যে অবস্থায় আনার কথা ছিল, সেই অবস্থায় ফেরত দেওয়ার চুক্তি হয়েছিল। ওই অবস্থায় ফেরত দিতে গিয়ে যে পরিমাণ টাকা দিতে হতো তার চেয়ে উড়োজাহাজের দাম ছিল কম। শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালে বিমান উড়োজাহাজটি কিনে নিয়ে সেই যাত্রায় বড় ধরনের টাকা পরিশোধ করা থেকে রক্ষা পেয়েছিল।

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2019

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!