নিঃসঙ্গ মৃত্যু, শোক ও শিক্ষা

শুক্রবার, ০৮ নভেম্বর ২০১৯ | ১১:৪১ অপরাহ্ণ | 19 বার

নিঃসঙ্গ মৃত্যু, শোক ও শিক্ষা

সদ্য প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির পরস্পর বিরোধী সত্তা। একদিকে তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং অন্যদিকে ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীল বিএনপি-জামায়াত জোটের রাজনৈতিক নেতা। তার মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবে সবাই শোকাহত। কিন্তু তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে রেখে গেছে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

একজন সরব ও মাঠের রাজনীতিবিদ সাদেক হোসেন খোকার নিঃসঙ্গ ও নীরব মৃত্যু সত্যিই শোকাবহ। প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বদেশে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারেননি এবং তার মৃত্যু হয়েছে একজন ‘রাষ্ট্রবিহীন নাগরিক’ হিসাবে।

অথচ ঘটনাটি মোটেই এমন হওয়ার কথা ছিলনা। স্বদেশের বীর সন্তান ও লড়াকু মুক্তিযোদ্ধাকে দেশের বাইরে নাগরিকত্বহীন পরিচয়ে নীরবে ও নিঃসঙ্গভাবে মরতে হবে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে তার জীবন, কর্ম ও রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যেই, যার কিছু কিছু বিচ্ছুরিত হয়েছে নানাজনের লেখায়।

বলার অপেক্ষা রাখেনা, স্বদেশ ও স্বজনদের থেকে বহুদূরের বিদেশ বিভুঁইয়ে মারা যাওয়া অনেক কষ্টের ও বেদনার। এবং মৃত্যুর শেষ সময়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করার আকাঙ্ক্ষা খুবই স্বাভাবিক। এমন স্বাভাবিক ঘটনা সাদেক হোসেন খোকার ক্ষেত্রে ঘটেনি।

কারণ, তিনি তার জীবনব্যাপী বিশ্বাসের রাজনীতি থেকে শুধু চরম বিপরীত দিকে ডিগবাজিই খাননি, মামলার আসামি ও বিতর্কিত ছিলেন। উদার, প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, দেশপ্রেমিক মনোভাবাপন্ন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একজন মুক্তিযোদ্ধার স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকার কথা, সেটাও তার ছিলনা।

একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও রাজনৈতিক অবস্থান বদল করে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। ঢাকা শহরের একজন ভূমিপুত্র ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদ হয়ে তিনি একাত্তরের গণধিক্কৃত পরাজিত শক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করার কাজ করেছেন।

শত শত ছবিতে তার সেসব বিতর্কিত অবস্থানের রেকর্ড স্পষ্টভাবে রক্ষিত আছে। আর আছে তার সম্পর্কে মানুষের দুঃখ ও বেদনা। স্বয়ং সাদেক হোসেন খোকা বিন্দুমাত্র পরোয়া না করলেও দেশপ্রেমিক-মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মানুষ তার রাজনৈতিক অধঃপতনে চরম ব্যথিত হয়েছেন।

রাজনৈতিক অধঃপতন তার ক্ষেত্রে আরও নানা রকমের স্খলন-পতনের কারণ হয়েছে, যেমনটি সকল পতিত, স্খলিত নেতার ক্ষেত্রে হয়। রাজনৈতিক পদস্খলনের পথ ধরে আর্থিক, সামাজিক নিম্নগামীতা তাকেও গ্রাস করে। বিএনপি-জামায়াতের জঙ্গিবাদী, সন্ত্রাসী রাজনীতির ধারাবাহিকতায় লুটপাত ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখলের খেলায়ও তিনি অংশ নেন। মুক্তিযোদ্ধা থেকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের সহযোগী রাজনীতিবিদের পাশাপাশি তিনি অঢেল সম্পদের মালিক হন।

পুরনো ঢাকার গোপীবাগের তরুণ থেকে তিনি পরিণত হন মিডিয়া টাইকুন ও বিজনেস ম্যাগনেটে। পাওয়ার পলিটিক্সের ঘোরপ্যাঁচযুক্ত আবর্তে মুক্তিযোদ্ধার স্বচ্ছতার বদলে তাকে আচ্ছন্ন করে যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গ দেওয়ার কলঙ্ক। একাত্তরের উজ্জ্বল সাদেক হোসেন খোকা মৃত্যুকালে ছিলেন মলিন।

তার মৃত্যুতে যেসব আলোচনা ও স্মৃতিচারণ হয়েছে, সবই মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব ও পরবর্তীকালের। প্রশংসাও তিনি পেয়েছেন অতীত কৃতিত্বের জন্য। ক্রমে ক্রমে তার মতাদর্শিক চ্যুতি নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়নি। মৃত্যুকে সামনে রেখে, সত্য হলেও অপ্রিয় কথাগুলো মানুষ বলতে চায় না। সাদেক হোসেন খোকার ক্ষেত্রে তেমনটিই হয়েছে।

তারপরেও কথা থেমে থাকেনি। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া হয়েছে। তার শেষজীবন ও মৃত্যু নিয়ে মানুষ কষ্ট পেয়েছে, যে কষ্ট স্বয়ং খোকা একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও নিজের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য বিরোধী কর্মের মাধ্যমে নিজেই সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের মতাদর্শের রাজনীতিতে তার মৃত্যু অনেকগুলো শিক্ষা রেখে গেলে। জানিয়ে গেলো আদর্শ ও আদর্শহীনতার তফাত।

বর্তমান ও অনাগতকালের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের সামনে সাদেক হোসেন খোকা একটি জ্বলন্ত শিক্ষা হয়ে থাকবেন। বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে আদর্শিক বিচ্যুতির যে ধারা থেমে থেমে বেগবান হয় এবং শুদ্ধ রাজনীতিকে কলুষিত ও দুর্বৃত্তায়িত করে, সে অপধারা এই নিঃসঙ্গ মৃত্যুর ঘটনা থেকে শিক্ষা নিলেই সকলের মঙ্গল।

লুৎফে আলি মহব্বত: লেখক, কলামিস্ট

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2019

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!