চকরিয়ার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি: দুইলক্ষ মানুষ পানি বন্দি

শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৯ | ১:১৬ অপরাহ্ণ | 328 বার

চকরিয়ার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি: দুইলক্ষ মানুষ পানি বন্দি

কক্সবাজারের চকরিয়ায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত পাহাড়ী ঢলের পানিতে চকরিয়ার ১৮ ইউনিয়ন ও পৌর এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। মাতামুহুরী নদীতে বিপদসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হচ্ছে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি। গত শনিবার থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টানা ৬ দিন ভারী বর্ষণ ও মাতামহুরী নদী দিয়ে বানের পানি প্রাবাহিত হওয়ায় মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভারী বর্ষণ ও ঢলের পানি তীব্র গতিতে চকরিয়ার লোকালয়ে প্রবেশ করছিল। ভারী বৃষ্টিপাত ও মাতামুহুরী নদীতে নেমে আসা ঢলের পানি দুই কূল উপচে সরাসরি লোকালয়ে প্রবেশ করায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে উপজেলার অন্তত দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্ধী হয়ে পড়েছে।

কয়েক ফুট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে বানিয়ারছড়া-বরইতলী-পেকুয়া সড়কে। এ কারণে জরুরি প্রয়োজনে মানুষ নৌকায় চেপে পারাপার করছে। অপরদিকে উপজেলা ও পৌরসভার প্রায় ২০ হাজার একর জমির মৌসুমী সবজি ফসল তিনদিন ধরে পানির নিচে তলিয়ে থাকায় কৃষিখাতে বড় ধরণের আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখিন হবেন কৃষকেরা। পাহাড়ে অতিবর্ষণের ফলে মাতামুহুরী নদীতে আশঙ্কাজনক ভাবে প্রবাহিত হচ্ছে ঢলের পানি। এতে আশঙ্কা করা হচ্ছে উপজেলার মিঠাপানির মৎস্য প্রকল্পগুলো তলিয়ে যেতে পারে। বেড়িবাঁধ অরক্ষিত থাকায় উপজেলার চিংড়িজোনের শতকোটি টাকার উৎপাদিত চিংড়িও ভেসে যেতে পারে। এই আশঙ্কা ভর করছে ঘের মালিক ও মৎস্য প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মাঝে।

ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, লক্ষ্যারচর, বরইতলী, সাহারবিল, চিরিংগা, কৈয়ারবিল ও উপকূলীয় সাত ইউপি ও পৌরসভার একাংশসহ বেশকটি ইউপির দেড়শতাধিক গ্রাম ডুবে রয়েছে । গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে পৌর সদরের থানা সেন্টার, উপজেলা, করাইয়াঘোনা, বিমান বন্দর, হালকাকারা, খোয়াজ নগর, কোচ পাড়া এলাকা। হারবাং, বরইতলী, বানিয়ারছড়া, কৈয়ারবিল, ইসলাম নগর, কাকারা, ছাইরাখালী, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা ও খুঠাখালী ইউনিয়নের একাধিক এলাকায় পাহাড় ধসের আশংকায় রয়েছে এলাকাবাসী।

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জালাল আহমদ সিকদার জানান, বানের পানিতে ভাসছে তার ইউনিয়নের ৬টি গ্রামের অন্তত ২০ হাজার মানুষ। অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোও বর্তমানে ঢলের পানির নিচে রয়েছে । এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা চরম ভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

চিরিঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জসীম উদ্দিন জানান, বানের পানিতে একাকার হয়ে পড়েছে চরণদ্বীপসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ। মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার উপরে প্রবাহিত হওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের চিংড়ি জোনের বেশিরভাগ মৎস্য ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে কয়েকশ কোটি টাকার মাছ পানিতে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কোনাখালী ইউপি চেয়ারম্যান এম দিদারুল হক সিকদার জানান বানের পানিতে তার ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম পানিতে ডুবে গেছে । এসব গ্রামের প্রায় ৭ হাজার পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। তিনি বলেন মাতামহুরী নদীর প্রবল স্রােতে তার ইউনিয়নের উপর দিয়ে যাওয়া বাঘগুজারা- কোনাখালী- বাংলাবাজার-বদরখালী সড়কটি নদী গর্ভে তলিয়ে গেছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকার গ্রামীণ অবকাঠামো। এতে চরম দুর্ভোগে নিপতিত হয়েছেন অন্তত ১০ হাজার মানুষ। এদিকে মাতামহুরী নদীতে ঢলের পানি বেড়ে যাওয়ায় চিরিঙ্গা ব্রিজের উপর দিয়ে চরম ঝুকিতে চলছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের যানবাহন গুলো। বর্তমানে চিরিঙ্গা ব্রিজটির মাঝখানে দেবে যাওয়ায় যে কোন মুহুর্তে বড় ধরনের দূর্ঘটনা ঘটে যেগে পাওে বলে আশঙ্কা করছে এলাকাবাসী।

কাকারা ইউপি চেয়ারম্যান শওকত ওসমান ও সুরাজপুর-মানিকপুরের ইউপি চেয়ারম্যান আজিমুল হক বলেন , আমাদের ইউপি দুটি মাতামুহুরী নদী একেবারে লাগোয়া। নদীর পানি বাড়তে থাকায় এলাকায় অধিকাংশ রাস্তা-ঘাট, স্কুল, ঘর-বাড়ি পানিতে তলিয়ে বার বার তলিয়ে যাচ্ছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে এলাকার জনসাধারণ। এমনকি বর্তমানে শতশত পরিবারের পারিবারিক রান্নার কাজও বন্ধ রয়েছে ।
কৈয়ারবিল ইউপি চেয়ারম্যান মক্কি ইকবাল হোছেন বলেন , টানা বৃষ্টিতে কৈয়ারবিলের বেশিরভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। ইউপির খিলছাদক, ভরন্যারচর, বানিয়ারকুম গ্রামের মানুষ এখন পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছেন।

চকরিয়া পৌরসভার মেয়র আলমগীর চৌধুরী বলেন, টানা বৃষ্টিতে দেড়শতাধিক পরিবার জলাবদ্ধতায় আটকা পড়েছেন। বন্যার পানি দ্রুত নামার জন্য পৌর ড্রেনগুলো পরিস্কার করা হয়েছে। মাতামুহুরী নদীর পানি এরই মধ্যে বিপদসীমার উপর প্রবাহিত হওয়ায় পৌর সভার অধিকাংশ এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। মাতামহুরীর ঢলের পানির তোড়ে চিরিংগা শহর রক্ষা বেড়ী বাঁধ ভেঙে যেতে পারে। এতে পৌরশহর হুমকীর মুখে পড়তে পারে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, বন্যা মোকাবিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সার্বক্ষণিক চারদিকে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তরে বন্যা তদারক সেল খোলা হয়েছে। পাশাপাশি সরেজমিন বিভিন্ন ইউনিয়নের বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শন করা হয়েছে। এসব বিষয় লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। কবলিত এলাকাগুলোতে শুকনো খাবার বিতরণ অব্যাহত রয়েছে । আরো শুকনো খাবারের চাহিদা চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বার্তা পাঠানো হয়েছে। জরুরী ভাবে কাল থেকে বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে ৩০ মে: টন চাল বিতরণ করা হবে। এর মধ্যে দূর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন ইউপির চেয়ারম্যানদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2019

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!