এইমাত্র পাওয়া

x

কক্সবাজার কারাগারের ৬ কর্মকর্তার সম্পদের অনুসন্ধান শুরু

মঙ্গলবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৬:১০ অপরাহ্ণ | 499 বার

কক্সবাজার কারাগারের ৬ কর্মকর্তার সম্পদের অনুসন্ধান শুরু

কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেল সুপার, জেলার ও দুই ডেপুটি জেলার সহ ৬ কর্মকর্তার অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তারই অংশ হিসাবে দুদক চট্রগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২ এর উপপরিচালক মাহবুবুল আলম ও উপসহকারী পরিচালক মো:রিয়াজ উদ্দিনকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে দুদক চট্রগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২ এর উপসহকারী পরিচালক মো: রিয়াজ উদ্দিন বলেন, কারাগার থেকে বিভিন্ন উপায়ে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের বিষয়টি দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম সত্যতা পাওযার পর কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেল সুপার (বর্তমান দিনাজপুর জেলা কারাগারে সুপার) বজলুর রশিদ আখন্দ, জেলার রিতেশ চাকমা, ডেপুটি জেলার মনির হোসেন ও অর্পন চৌধুরী, ফার্মাসিস্ট ফখরুল আজম, ডাক্তার মহিউদ্দিন চৌধুরীর সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

জানা যায়, কক্সবাজার জেলা কারাগারের ৩ নম্বর সেলের ২ নম্বর ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডকে ঘিরে সবসময় কারারক্ষীদের ভিড় লেগেই থাকে। কারা কর্মকর্তাদের আনাগোনাও বেশি এই ওয়ার্ডে। ওয়ার্ডের বন্দিরা সবাই যেন ‘ভিআইপি’। তারা মোবাইল ফোনে কথা বলেন। গরুর মাংস, মুরগি ও বড় মাছ দিয়ে রাজসিক খাবার পরিবেশন করা হয় তাদের। ওয়ার্ডের দেয়াল ও ফ্লোরে ঝকঝকে নতুন টাইলস লাগানো হয়েছে। ওয়ার্ডের প্রত্যেক বন্দি ৫০ হাজার টাকা মাসোহারা দিয়ে এসব সুযোগ নিচ্ছেন। আর প্রতিদিনের জন্য বাড়তি অর্থ তো আছেই। এখানকার বন্দিরা আর কেউ নন; সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে আত্মসমর্পণ করা কোটিপতি ইয়াবা কারবারি তারা। তাদের মধ্যে রয়েছেন কক্সবাজারের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির চার ভাই আবদুস শুক্কুর, আমিনুর রহমান, মো. ফয়সাল রহমান ও শফিকুল ইসলাম। পাশাপাশি আছেন আরও একাধিক কোটিপতি ইয়াবা কারবারি। এই কারাগারে অভিযান শেষে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২ থেকে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গত ১৬ জুন দুদক কক্সবাজার কারাগারে অভিযান চালায়। এতে অংশ নেয় দুদকের সহকারী পরিচালক হুমায়ুন কবির ও উপসহকারী পরিচালক মো. রিয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বিশেষ দল। ‘দুদকের ওই অভিযানে কক্সবাজার জেলা কারাগারে বেশুমার অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া সেটা প্রতিবেদন আকারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশসহ ই-মেইলযোগে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। প্রতিবেদনে ৬ কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেরও সুপারিশ করা হয়।’
দুদকের সরেজমিন ওই অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজার জেলা কারাগার যেন ইয়াবা কারবারিদের স্বর্গরাজ্য। জেলার ইয়াবা কারবারি ছাড়াও সারা দেশের বড় ইয়াবা কারবারিরা তদবির করে এ কারাগারে বদলি হয়ে আসেন। এই কারাগারের ৪ হাজার ৩৮৮ জন বন্দির মধ্যে ৭০ শতাংশই ইয়াবা কারবারি। কারারক্ষীরা ইয়াবা কারবারিদের টার্গেট করে অর্থ আদায় করেন। আর এতে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হন সাধারণ বন্দিরা। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বদির কয়েকজন স্বজনসহ আত্মসমর্পণ করা ১০২ জন ইয়াবা কারবারিকে কক্সবাজার কারাগারে রাখা হয়েছে। তাদের কারণে অন্য বন্দিরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারাবন্দিদের কাছে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি করা হয় ১৭০০ টাকায়। মুরগির মাংস (ব্রয়লার) বিক্রি হয় ৬০০ টাকা কেজি দরে। এই উচ্চ দামের মাংসের ক্রেতারা হচ্ছেন আত্মসমর্পণ করা কোটিপতি ইয়াবা কারবারিরা। কারাগারে বন্দিদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করার সুযোগ দিয়ে কারারক্ষীরা প্রতি পাঁচ মিনিটের জন্য অবৈধভাবে আদায় করেন ১২০০ টাকা। অতিরিক্ত প্রতি মিনিটের জন্য নেওয়া হয় ১০০ টাকা হারে।
দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাসোহারা দিয়ে কারা হাসপাতালের বেডগুলোর প্রায় সবকটিই ইয়াবা কারবারিরা দখল করে রেখেছেন। কেউ পরিদর্শনে গেলে দ্রুত তাদের সরিয়ে সেখানে কয়েকজন অসুস্থ ও পাগল-প্রকৃতির লোক এনে রাখা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কক্সবাজার কারাগারের ২০টি ওয়ার্ডে পাঁচটি ক্যান্টিন আছে। এছাড়া ওয়ার্ডের বাইরে কারা ফটকেও রয়েছে আরেকটি ক্যান্টিন। ক্যান্টিনগুলো বন্দিদের জিম্মি করে টাকা উপার্জনের বড় ফাঁদ। বিশ্বস্ত কয়েদিদের সহায়তায় রক্ষীরাই ক্যান্টিনগুলো নিয়ে গলাকাটা বাণিজ্য করেন। খাবার-দাবার থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্য পাওয়া যায় এসব ক্যান্টিনে। সেখানে প্রকৃত দামের তিন-চারগুণ বেশি দাম রাখা হয়। বন্দিদের স্বজনরা বাইরে থেকে কোনো পণ্য নিয়ে ভেতরে দিতে পারেন না। নির্ধারিত চড়া দামে ক্যান্টিন থেকেই সবকিছু কিনতে হয়। ক্যান্টিনগুলো থেকে মাসে প্রায় কোটি টাকা মুনাফা হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। যার বড় অংশই যায় কারারক্ষী ও কর্মকর্তাদের পকেটে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কারাগারে পানির অভাব হওয়ায় আত্মসমর্পণ করা টেকনাফের হ্নীলা গ্রামের বাসিন্দা এক ইয়াবা কারবারি ৭-৮ লাখ টাকা খরচ করে দুটি গভীর নলকূপও স্থাপন করে দিয়েছেন। এরপর থেকে তিনি বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন। ২০টি ওয়ার্ডের যেখানেই ইচ্ছা সেখানেই থাকতে পারেন তিনি।
দুদকের অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা কারাগারের সাবেক তত্ত্বাধায়ক বজলুর রশীদ আখন্দ বলেন, ‘আমার কারাগারে ৫৩০ জন ধারণক্ষমতার মধ্যে বন্দি আছে ৪ হাজার ৩৮৮ জন। যাদের ৭০ শতাংশই ইয়াবা কারবারি। তাদের সেলে না রাখলে আমি কোথায় রাখব? ইয়াবা কারবারি বলে তো আমি তাদের ক্রসফায়ারে দিতে পারি না, তাদের ওয়ার্ডেই রাখতে হবে।’

দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2019

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!