এইমাত্র পাওয়া

x

ইসলামের ইতিহাস

ইতিহাসের প্রাচীনতম আবাসিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

শুক্রবার, ১২ এপ্রিল ২০১৯ | ২:৫৪ অপরাহ্ণ | 131 বার

ইতিহাসের প্রাচীনতম আবাসিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

ইসলামের ইতিহাসের প্রায় সূচনাকাল থেকেই চিকিৎসা শাস্ত্রের চর্চার তথ্য পাওয়া যায়। খন্দকের যুদ্ধের পর আহতদের চিকিৎসার জন্য রাসুল সা.-এর নির্দেশে স্থাপিত ‘তাবু’কে ইসলামের ইতিহাসের চিকিৎসা সেবার প্রথম নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়। হজরত খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে মুসলিম বিশ্বে চিকিৎসা সেবা ও এই বিষয়ের চর্চা আরও বৃদ্ধি পায়। আর প্রাতিষ্ঠানিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার চর্চার সূচনা হয় উমাইয়া খলিফাদের শাসনকালে।

হজরত মুয়াবিয়া রা. ৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে দামেস্কে একটি চিকিৎসা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে চিকিৎসা বিদ্যার উপর পাঠদানও হতো। এটি ছিলো মূলত “জামি’ আল-উমাবি”-এর একটি বিভাগ। পরবর্তী মুসলিম খলিফাগণ চিকিৎসা সেবা ও চিকিৎসা বিজ্ঞান চর্চায় আরও বেশি মনোযোগী হন। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম বিশ্বে চিকিৎসা সেবা আরও আধুনিক ও বিস্তৃতি লাভ করে। উমাইয়া যুগে শুরু হওয়া এসব হাসপাতালকে ইতিহাসে ‘বিমারিস্তান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসলামের ইতিহাসের একটি প্রাচীনতম বিমারিস্তান হলো ‘বিমারিস্তান আন-নাসিরি’ (পরবর্তী নাম সালাহি)। ধারণা করা হয়, এটিই ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীন পূর্ণাঙ্গ আবাসিক সুবিধাসম্পন্ন বিমারিস্তান। যেখানে রোগী, চিকিৎসক, শিক্ষার্থী, সেবক-সেবিকা সবার জন্য পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ব্যবস্থা ছিলো। আধুনিক পরিভাষা অনুযায়ী বলা যায়, ‘বিমারিস্তান সালাহি’ ইসলামের ইতিহাসের প্রথম আবাসিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

৫৬৭ হিজরি মোতাবেক ১১৭১ খ্রিস্টাব্দে মিসরের ফাতেমি খেলাফতের সুলতান নির্বাচিত হওয়ার পর সালাহ উদ্দিন আইয়ুবি হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন। মিসরের ফাতেমি উবাইদি খেলাফতের সুলতান নির্বাচিত হয়ে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করার পর তিনি বিশাল রাজপ্রাসাদের কক্ষগুলো মন্ত্রী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাঝে ভাগ করে দেন। এমনকি পূর্ববর্তী সুলতানদের ব্যবহৃত একটি কক্ষ তিনি প্রাসাদের দাস-দাসীর জন্য বরাদ্দ করেন।

ফাতেমি সুলতানদের রাজপ্রাসাদের একটি বিশেষ হলরুম ছিলো -যাতে কোনো পোকা-মাকড় প্রবেশ করতে পারতো না, প্রাকৃতিক নিয়মেই নিয়ন্ত্রণ করা হতো তার শীত ও তাপ, হলরুমের দেয়াল কুরআনের আয়াত দ্বারা সুসজ্জিত- সালাহ উদ্দিন আইয়ুবি তাকে হাসপাতালে পরিণত করার নির্দেশ দেন। আল-আজিজ বিল্লাহ ৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে বিশেষ নিয়মে তৈরি এই হলরুমটি নির্মাণ করেন।
বর্তমানে যা ‘মানজিলুল গামারি আল হাসরি’-এর অন্তর্ভূক্ত। সুলতান সালাহ উদ্দীন আইয়ুবি তার নাম দেন ‘কাসরুশ শাওকি’। এখানেই পূর্ববর্তী খলিফারা সভাসদদের সঙ্গে বৈঠক করতেন। সুলতান সালাহ উদ্দীন আইয়ুবি হলরুমটিকে হাসপাতাল করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, অসুস্থ মানুষের জন্য এটিই সর্বোত্তম স্থান।

হলরুমটি হাসপাতালে পরিণত করার পর সালাহ উদ্দিন আইয়ুবি হাসপাতালের জন্য চিকিৎসক, শল্য চিকিৎসক, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, মানসিক চিকিৎসক, পরিচালক, কর্মকর্তা ও সেবক-সেবিকা নিয়োগ দেন। সম্পূর্ণ আবাসিক সুবিধাসম্পন্ন ‘বিমারিস্তান সালাহি’র রোগীদের ওষুধ, আহার, পানীয়সহ যাবতীয় ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে পরিশোধ করা হতো। ফ্রি চিকিৎসা ও খাবারের পাশাপাশি তাদেরকে পোশাকসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও প্রদান করা হতো।

হাসপাতালে আরও নিয়োগ দেওয়া হয় বিশেষ সেবক (পরিদর্শক অর্থে) তারা সকাল-সন্ধ্যা রোগীদের খোঁজ-খবর নিতেন এবং প্রয়োজনীয় সেবার পরামর্শ দিতেন। হাসপাতালে নারীদের চিকিৎসার জন্য ছিলো একই রকম পৃথক ব্যবস্থা। তারাও একই রকম সেবা লাভ করতো।

এছাড়াও হাসপাতালে ছিলো মানসিক রোগীদের জন্য বিশেষ বিভাগ। পৃথক ভবনে পরিচালিত বিভাগে মানসিক রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হতো। পথে-ঘাটে ঘুরতে থাকা মানসিক রোগীদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে চিকিৎসা করানো হতো।

রোগীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তৎকালীন যুগের সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হতো। রোগীদের নাম, রোগের বিবরণ, প্রয়োগকৃত ওষুধ ও তার প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি বিষয় হাসপাতালে রেজিস্ট্রারে সংরক্ষণ করা হতো।

সুলতান সালাহ উদ্দীন আইয়ুবি নিজে হাসপাতালের তদারকি করতেন। রোগীদের সাথে নিজে কথা বলতেন। হাসপাতালের উন্নতিতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতেন।

ফাতেমি খেলাফতের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে হাসপাতালে কর্মরতদের বেতন ছিলো সর্বোচ্চ। একজন কর্মকর্তাকে দুইশো স্বর্ণ মুদ্রা পর্যন্ত বেতন দেওয়া হতো। হাসপাতালের সেবায় সমাজের উচ্চ শ্রেণি থেকে নিম্ন শ্রেণি পর্যন্ত সবাই অত্যন্ত সন্তুষ্ট ছিলেন। রাষ্ট্রের সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকার পরও তারা ব্যক্তিগতভাবেও হাসপাতালের কোষাগারে অর্থ দান করতেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকরাও তাদের উৎপাদিত ফসল এনে জমা দিতেন হাসপাতালের কল্যাণ তহবিলে। হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম বৃদ্ধি ও কর্মরতদের প্রতি সম্মানপ্রদর্শনের জন্যই এই দান তারা করতেন বলে ঐতিহাসিকদের দাবি।

অবারিত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও মানুষের সহযোগিতা থাকার পরও হাসপাতালের আয়-ব্যয়ের হিসাব অত্যন্ত কঠোরভাবে রক্ষা করা হতো। চিকিৎসকের বেতন, ওষুধের দাম, চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি বিষয় নথিভূক্ত করে রাখা হতো।
স্পেনের মুসলিম পরিব্রাজক আবুল হাসান মুহাম্মদ ইবনে জোবায়ের ১১৮২ খ্রিস্টাব্দে মিসর সফরে যান। তিনি তার সফরনামায় ফাতেমি খেলাফতের গৌরবময় অর্জনসমূহের বিবরণে হাসপাতালটির কথা উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন, ‘এই রাজ্যে আমরা গৌরবময় যা কিছু দেখেছি তার অন্যতম ‘মারিস্তান’ (বিমারিস্তান)। এটি রাজপ্রাসাদের ভেতের অবস্থিত। সুন্দর ও খোলামেলা পরিবেশ। হাসপাতাল কেন্দ্র করে এখানে অনেক ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে অনেকগুলো ওষুধের দোকান, খাদ্য-পানীয় ও প্রয়োজনীয় আসবাবের দোকান গড়ে উঠেছে।’

সুলতান সালাহ উদ্দিন আইয়ুবি তার সময়ের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকদের এই বিমারিস্তান সালাহিতে একত্র করার চেষ্টা করেন। সিরিয়া ও মামলুকদের রাজ্যের চিকিৎসা বিজ্ঞানী, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক, চিকিৎসক ও ওষুধ প্রস্তুতকারকদের তিনি এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানাতেন এবং তাদেরকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতেন।

বিমারিস্তান সালাহিতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পাঠদান করা হতো। তবে এর প্রায় পুরোটাই ছিলো প্রায়োগিক। বইনির্ভর ও তাত্ত্বিক শিক্ষার ব্যবস্থা ছিলো দুর্বল। মূলত অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিখতেন। শুধু মৌলিক ও অতিপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলোই তাদেরকে লিখিতাকারে পড়ানো হতো। অবশ্য পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ইবনে আবিল বয়ান ‘দাস্তুরু বিমারিস্তান’ নামে গ্রন্থ রচনা করেন। মিসরীয় চিকিৎসা বিজ্ঞানের যা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

সুলতাল সালাহ উদ্দিন আইয়ুবির বিমারিস্তানে মোট ১৮ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কর্মরত ছিলেন। তাদের মধ্যে ৮ জন মুসলিম, ৫ জন ইহুদি, ৪ জন খ্রিস্টান ও ১ জন সামেরি (প্রকৃতি পূজারী)। বিমারিস্তিান সালাহিতে কর্মরত চিকিৎসকদের মধ্যে মুসা বিন মায়মুন, হিব্বাতুল্লাহ ইবনু জামি ইসরাইলি ছিলেন অত্যন্ত খ্যাতিমান। চিকিৎসকদের মধ্যে ইবনু মাতরান দামেস্ক থেমে কায়রো আসেন এবং তিনি খ্রিস্ট ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেন। সুলতান সালাহ উদ্দিন তার সম্মানে ১০ হাজার কিতাব সম্বলিত একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন।

এই বিমারিস্তান নাসিরির শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে চিকিৎসা শাস্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন হলেন, রিজাদ্দিন রাহবি, ইবরাহিম বিন রঈস মায়মুন, ইবনে আবি উসাইবায়াহ, সাদিদ ইবনে আবিল বয়ান ও কাজি নাফিসুদ্দিন জোবায়ের প্রমুখ।

আবরারের মৃত্যু আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়ে গেল – ইশতিয়াক আহমেদ
দৈনিক দৈনন্দিন এ প্রকাশিত কোন ছবি,সংবাদ,তথ্য,অডিও,ভিডিও কপিরাইট আইনে অনুমতি ব্যতিরেখে ব্যবহার করা যাবে না ।

Copyright @ 2019

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!